ভারতের বাজারে পাটপণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের নতুন বেড়াজালে চাপে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা

ভারতে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ গত ২৫ জুন প্রকাশিত ৯৮ পৃষ্ঠার এক চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বিদ্যমান অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বহাল রাখার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানভেদে নতুন শুল্কহার নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের পাটকল মালিক, চাষি এবং সামগ্রিক পাটশিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই সুপারিশের ভিত্তিতে প্রজ্ঞাপন জারি করলেই নতুন শুল্কহার কার্যকর হবে। বর্তমানে ৫৫টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াহাব জুট মিলসের পাটসুতার ওপর প্রতি টনে ৬৯ মার্কিন ডলার শুল্ক নির্ধারণের সুপারিশ করা হলেও তালিকার বাইরে থাকা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য তা ধার্য করা হয়েছে ৪৪৫ মার্কিন ডলার। ফলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক সংকটে পড়তে পারেন।
তবে চারটি প্রতিষ্ঠান—জনতা জুট মিলস, ন্যাশনাল জুট ম্যানুফ্যাকচারিং করপোরেশন, আলহাজ জুট মিলস এবং সাদাত জুট ইন্ডাস্ট্রিজের ওপর আরোপিত শুল্ক শূন্য করার সুপারিশ করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এই বৈষম্যমূলক শুল্ক কাঠামো নিয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাপস প্রামাণিক এই পরিস্থিতিকে ‘গলার ফাঁস’ হিসেবে অভিহিত করে জানিয়েছেন, পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে সরকারকে দ্রুত কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভারতের দাবি, বাংলাদেশি পাটপণ্য অস্বাভাবিক কম দামে বাজারে আসার ফলে তাদের অভ্যন্তরীণ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারদর, বিনিময় হার এবং উৎপাদন খরচের বাস্তবতায় এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। সরকারি তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮১৫ টন পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছিল, যা এখন কিছুটা কমে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫২৩ টনে দাঁড়িয়েছে।
বাণিজ্য ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, ভারত সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু আলোচনার চেয়েও ডব্লিউটিওর নিয়ম অনুযায়ী আইনি লড়াই এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, অতীতে রহিমআফরোজের ব্যাটারির ক্ষেত্রে ভারত যে নমনীয়তা দেখিয়েছিল, পাটের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সেই আইনি পথ অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে ১১ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে শুল্ক প্রতিবন্ধকতা দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প বাজারের সন্ধানে নামতে হবে, যা দেশের পাটকল ও কর্মসংস্থান খাতে গভীর সংকটের জন্ম দিতে পারে।
