ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনার দাবি জোরালো

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে ওয়াশিংটনে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে আইন প্রণেতাদের অনুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে ২০১৫ সালে প্রণীত ‘ইরান নিউক্লিয়ার এগ্রিমেন্ট রিভিউ অ্যাক্ট’ বা ‘ইনারা’ (আইএনএআরএ) আইনটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। রিপাবলিকান আইন প্রণেতা এবং ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী এই আইনের দোহাই দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তিনি এই সমঝোতা স্মারকটি কংগ্রেসের পর্যালোচনার জন্য উপস্থাপন করেন।
আইন অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত যেকোনো চুক্তি সম্পাদনের পাঁচ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে তা কংগ্রেসের কাছে জমা দিতে হয়। এরপর ৩০ দিনের একটি পর্যালোচনা সময়কাল শুরু হয়, যেখানে কংগ্রেস চাইলে চুক্তির বিরোধিতা করে যৌথ প্রস্তাব পাস করতে পারে। যদিও প্রেসিডেন্ট এই প্রস্তাব ভেটো প্রদানের মাধ্যমে বাতিল করতে পারেন, তবে তা ঠেকাতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়, যা অত্যন্ত কঠিন একটি শর্ত। এই সময়কালে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ প্রেসিডেন্টের নেই বলে আইনে উল্লেখ রয়েছে।
ট্রাম্প অবশ্য এই সমঝোতা স্মারকটি কংগ্রেসের কাছে পাঠানোর বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে তার প্রশাসন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো অবস্থান স্পষ্ট করেনি। বিশেষ করে এই সমঝোতায় ইরানের জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের ওপর থেকে তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। হার্ভার্ড ল স্কুলের অধ্যাপক জ্যাক গোল্ডস্মিথের মতে, প্রেসিডেন্টের বর্তমান নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এসব নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার আইনি ভিত্তি দুর্বল।
এদিকে, এই বিতর্ককে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে চরম মেরুকরণ। ডেমোক্র্যাটিক দলের অনেক সদস্য এবং যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলো রিপাবলিকানদের এই ভূমিকাকে ‘ভণ্ডামি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের অভিযোগ, যখন ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তখন এই আইন প্রণেতারা নীরব ছিলেন। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, যুদ্ধের শুরুতেই যারা নিজেদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তারাই এখন যুদ্ধ থামাতে কংগ্রেসের হস্তক্ষেপ দাবি করছেন।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সমঝোতা স্মারকটি ‘ইনারা’ আইনের আওতাভুক্ত কি না, তা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও আইনটির উদ্দেশ্য ছিল কংগ্রেসকে এ ধরনের সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ত করা। ওবামা প্রশাসনের সাবেক আইনি উপদেষ্টা টেস ব্রিজম্যানের মতে, এই নতুন সমঝোতা স্মারক এবং ভবিষ্যতে হতে যাওয়া যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তি অবশ্যই এই আইনের আওতাধীন হওয়া উচিত। তবে তিনি এমনও মন্তব্য করেছেন যে, চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করতে এই আইনটি বাতিল করাই শ্রেয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার ক্ষমতার যে ব্যাপক বিস্তৃতি দেখা গেছে, তাতে শেষ পর্যন্ত তিনি কংগ্রেসের সহযোগিতা নেবেন কি না, তা নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একাংশ যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, এই সমঝোতা স্মারকটি কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়, বরং চুক্তিতে পৌঁছানোর একটি রূপরেখা মাত্র। তবে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আইন প্রণেতারা তাদের হৃত কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের লড়াই করছেন, আর ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় নিজেদের কৌশল আঁটছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা