ইতিহাসের বৃহত্তম ফুটবল মহাযজ্ঞে তিন দেশের যৌথ আয়োজন কেন এক অনন্য মাইলফলক

ফুটবল বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে আয়োজিত হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ। ফুটবলের এই মহাযজ্ঞকে কেন্দ্র করে পুরো বিশ্বে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের ৯৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন যৌথ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত ৪৭ সালের ফিফা কংগ্রেসে উত্তর আমেরিকার এই তিন দেশ ‘ইউনাইটেড বিড’-এর মাধ্যমে যৌথভাবে আয়োজক হওয়ার অধিকার অর্জন করে। ফিফার সদস্য দেশগুলোর দেওয়া ২০০ ভোটের মধ্যে ৬৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তারা এই সুযোগটি নিশ্চিত করে।
টুর্নামেন্টের কলেবর বৃদ্ধির কারণেই মূলত যৌথ আয়োজনের পথে হেঁটেছে ফিফা। এবারের আসরে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮-এ উন্নীত করা হয়েছে, যার ফলে মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এই সংখ্যা ৪০টি বেশি। একক কোনো দেশের পক্ষে এতো বিপুল সংখ্যক ম্যাচ আয়োজন করা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বজায় রাখা কার্যত অসম্ভব ছিল। সেই সংকট কাটাতেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এই তিন দেশের ১৬টি শহরে থাকা স্টেডিয়ামগুলো আগে থেকেই আন্তর্জাতিক মানের এবং এগুলোতে বড় ধরনের কোনো নির্মাণকাজ ছাড়াই ম্যাচ আয়োজনের সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিটি স্টেডিয়ামের গড় দর্শক ধারণক্ষমতা ৬৮ হাজারেরও বেশি, যা ফিফার মানদণ্ড পূরণ করেছে।
উত্তর আমেরিকার এই আয়োজন অর্থনৈতিক দিক থেকেও হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, এই বিশ্বকাপ তিনটি দেশে মোট ৮০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের গ্রস আউটপুট তৈরি করবে, যার মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ৩০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ফিফার আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে চার বছরের চক্রে সংস্থাটির মোট আয় হতে পারে ১৩ বিলিয়ন ডলার, যা কাতার বিশ্বকাপের ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এর আগে রাশিয়া বিশ্বকাপের চক্রে ফিফার আয় ছিল ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য এবারের বিশ্বকাপে ভ্রমণের চ্যালেঞ্জও থাকছে অনেক। বেশিরভাগ দল নির্দিষ্ট ক্লাস্টারে ম্যাচ খেললেও অনেককে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা দলকে গ্রুপ পর্বে প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করতে হবে। টরন্টো থেকে শুরু করে লস অ্যাঞ্জেলেস এবং এরপর সিয়াটলে তাদের ম্যাচগুলো থাকায় খেলোয়াড়দের ওপর ভ্রমণের ক্লান্তি ভর করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নকআউট পর্বে গড়ালে এই ভ্রমণের পরিধি আরও বাড়বে। টুর্নামেন্টের বড় ম্যাচগুলো, বিশেষ করে কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের মাঠগুলোতে। সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ আয়োজন কেবল ফুটবলের লড়াই নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সক্ষমতার এক বিশাল প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে।