নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে নাকাল জনজীবন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন বাজেটে কঠোর চ্যালেঞ্জ

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে জর্জরিত দেশের সাধারণ মানুষ এখন দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে। চাল, ডাল, আটা, তেল থেকে শুরু করে শাকসবজি ও আমিষ—সব ধরনের নিত্যপণ্যের বাজারদর নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় সংসার চালাতে অনেককেই ধারদেনার আশ্রয় নিতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বর্ধিত দর সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও উসকে দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক কর্মজীবীর আয় গত কয়েক বছরে নামমাত্র বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ। আগে মাস শেষে যে সামান্য সঞ্চয়টুকু থাকত, এখন তা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেছে। বরং সঞ্চয় ভেঙে বা ঋণ করে অতিকষ্টে সংসার চালাতে হচ্ছে সাধারণ পরিবারগুলোকে। বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১১ মাসে জাতীয় মজুরি হার কখনোই মূল্যস্ফীতিকে অতিক্রম করতে পারেনি, ফলে দেশের মানুষের প্রকৃত আয় ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বাণিজ্যিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক বছরে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৫ শতাংশ পর্যন্ত, যা বর্তমানে কেজিপ্রতি ৫২ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই; বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বছরে ১০ টাকা বেড়ে ১৯৯ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সবজির বাজার দীর্ঘ সময় ধরেই চড়া, যেখানে ভরা মৌসুমেও কোনো সবজি কেজিপ্রতি ৪০ টাকার নিচে পাওয়া দুষ্কর ছিল। এসব নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রীতিমতো একটি অদৃশ্য করের মতো চেপে বসেছে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতিকে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও অর্থনীতিবিদরা একে বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন। পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করে বলেছেন, বাজেটের আকার ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াবে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের চাপ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকেও সংকুচিত করতে পারে, যা অর্থনীতির সামগ্রিক গতিপ্রকৃতিকে শ্লথ করে দিতে পারে।
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় বাজার ব্যবস্থার ওপর কঠোর তদারকি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত প্রায় ৬ কোটি মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং চালসহ নিত্যপণ্যের বাজার সহনীয় রাখতে কার্যকর কৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই। দীর্ঘমেয়াদী এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে বাজেট কৌশলে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়াই এখন সময়ের প্রধান দাবি।