বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় থমকে আছে চট্টগ্রামের শিশু ধর্ষণের হাজারো মামলা

চট্টগ্রামে গত এক দশকে শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ দীর্ঘসূত্রতা আর বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ন্যায়বিচারের আশা সুদূরপরাহত হয়ে পড়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এক দশকে নগরীর বিভিন্ন থানায় দায়ের করা শিশু ধর্ষণের মামলার সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অধিকাংশ মামলার চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হচ্ছে না, ফলে বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস ও হতাশা কেবল দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

থানা ও আদালতের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম নগরীর ১৬ থানায় ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলা ছিল ৭৮টি, যা ২০১৯ সালের প্রথম ১১ মাসেই বেড়ে দাঁড়ায় ২২৭টিতে। জাতীয় পর্যায়েও পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। সরকারের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে নথিভুক্ত ৪ হাজার ৫৪১টি ধর্ষণ মামলার মধ্যে মাত্র ৬০টির বিচার সম্পন্ন হয়েছে, যার অর্থ প্রায় ৭৩ শতাংশ মামলা এখনো ঝুলে আছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কর্তৃক তদন্তকৃত ১১ হাজারের বেশি মামলার মধ্যে ৪৪ শতাংশই তদন্তে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি, যার বড় একটি কারণ তদন্তের অদক্ষতা ও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব।

বিচার বিলম্বের নেপথ্যে ডিএনএ রিপোর্ট প্রাপ্তিতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের জটিলতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক নওশেল কোরেশি জানান, ২০২২ সালে সংঘটিত সাত বছরের এক শিশু হত্যা মামলায় ডিএনএ প্রতিবেদনের অপেক্ষায় চার্জশিট দাখিল করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। ফলে ঘটনার চার বছর পর এখন বিচারকাজ শুরু করার আনুষ্ঠানিকতা চলছে। একই চিত্র দেখা যায় চান্দগাঁওয়ের রহিমা আক্তারের মামলায়, যেখানে ছয় বছর পার হলেও বিচার অধরা রয়ে গেছে।

সাক্ষী সুরক্ষা আইনের অভাব এবং পুলিশি তদন্তের দুর্বলতাকে বিচারহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আখতার কবির চৌধুরী বলেন, সাক্ষী হাজির করার ক্ষেত্রে পুলিশের গাফিলতি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে অনেক পরিবার আপস করতে বাধ্য হয়। সারা দেশে ডিএনএ পরীক্ষার একমাত্র ল্যাবটিতে সক্ষমতার চেয়ে বেশি চাপ থাকায় রিপোর্ট পেতে এক থেকে চার বছর পর্যন্ত সময় লাগছে, যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মৌমিতা পাল। তিনি বলেন, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা এবং অপরাধীদের মধ্যে সৃষ্ট ‘ধরা পড়লেও কিছু হবে না’—এমন মানসিকতা অপরাধপ্রবণতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংকট নিরসনে কেবল আইন কঠোর করা নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়ার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশ্লেষকরা।

বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমানের নেতৃত্বে অপরাধ নির্মূল ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ঘোষণা থাকলেও, চট্টগ্রামের বাস্তবতা বলছে, ভুক্তভোগীরা আজও দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে বন্দী। ন্যায়বিচার না পেয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হওয়ার উদাহরণও কম নয়। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায়, সহজলভ্য ভিকটিম, নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অপরাধীদের নির্ভীকতা—এই তিনের সম্মিলনে সমাজ আজ শিশু সুরক্ষার এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

0%
0%
0%
0%