গাজায় নতুন প্রশাসনিক অঞ্চল তৈরির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের নীল নকশা ইসরায়েলের

গাজার দক্ষিণ অঞ্চলে তথাকথিত ‘গ্রিন রাফাহ’ প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে নতুন প্রশাসনিক অঞ্চল তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইসরায়েল। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজাকে স্থায়ীভাবে খণ্ডিত করা এবং ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করাই এই কৌশলের মূল লক্ষ্য। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজের অনুমোদিত এই প্রকল্পটিকে আরব আমিরাতের অর্থায়নে পরিচালিত একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
প্রকল্পটির অধীনে গাজার রাফাহর পূর্বাঞ্চলে অস্থায়ী আবাসন তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে কোনো ধরনের ভ্রাম্যমাণ ঘর বা ক্যারাভান প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বিদ্যুৎ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মতো অবকাঠামো তদারকি করলেও, ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের জন্য রাখা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা। মূলত হামাসের প্রভাবমুক্ত এলাকা গড়ার আড়ালে ইসরায়েল এই ভূখণ্ডে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক গবেষক আহমেদ আল-আতাউনেহ সতর্ক করে বলেছেন যে, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের সামনে তিনটি নির্মম পথ খোলা রাখছে: ইসরায়েলি নীতির কাছে আত্মসমর্পণ, প্রতিরোধ গড়ে তুললে মৃত্যু অথবা কারাবরণ, নতুবা দেশত্যাগ। তিনি মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে মুছে ফেলে তাদের কেবল ‘অধিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ইস্যুকে পুরোপুরি নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র চলছে। ইসরায়েলি পার্লামেন্টের বর্তমান মনোভাব এবং ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক সত্তাকে অস্বীকার করার নীতির সাথে এই প্রশাসনিক জোন তৈরির পরিকল্পনা সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এদিকে, গাজার মানবিক সংকটকে রাজনৈতিক চাপের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন গবেষক মোহাম্মদ হামিদ আল-আইলা। গত বছর মিসরের শার্ম আল-শেখে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে অস্থায়ী আবাসন ও বেসামরিক অবকাঠামো মেরামতের নিশ্চয়তা থাকলেও ইসরায়েল তা ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষা করে আসছে। আল-আইলার মতে, ভ্রাম্যমাণ ঘর প্রবেশে বাধা এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা গাজায় মানবিক বিপর্যয়কে স্থায়ী করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।
আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বাহিনীর (আইএসএফ) মোতায়েন নিয়েও তৈরি হয়েছে ব্যাপক ধোঁয়াশা। মরক্কো ও উগান্ডার মতো দেশ থেকে নামমাত্র মাত্র ২০০ সৈন্য পাঠানোর পরিকল্পনা থাকলেও, এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। ফিলিস্তিনিদের দাবি—এ ধরনের বাহিনী তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, কিন্তু ইসরায়েল চাচ্ছে এই বাহিনীকে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ করতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের অনৈক্য দূর করে জাতীয় ঐক্য ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
