যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আর নেই

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। রোববার ( ১ মার্চ ) ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানে খামেনি নিহত হয়েছেন।
শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায়। ওই হামলায় খামেনিসহ তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন বলে আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা জানায়। নিহতদের মধ্যে তাঁর মেয়ে, জামাতা, এক নাতি ও এক পুত্রবধূর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
খামেনির মৃত্যুতে ইরান সরকার ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের দীর্ঘ শাসন
১৯৮৯ সালে ইরানের বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন আলী খামেনি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে পশ্চিমা সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর শাসন উৎখাত করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
খামেনি দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি শিয়া আলেমদের প্রভাব বাড়ান এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান ভিত্তিতে পরিণত করেন। এই বাহিনী সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও সংঘাত
খামেনির আমলে ইরান সরাসরি যুদ্ধের বদলে আঞ্চলিক মিত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে তেহরান।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো ইরান ও ইসরায়েল সরাসরি একে অপরের ওপর হামলা চালায়। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালায় এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানীরা নিহত হন। এর জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
পারমাণবিক কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক চাপ
খামেনি বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর অবস্থান নেন। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করতে সম্মত হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে সরে গেলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর ইরান ধীরে ধীরে চুক্তির সীমা অতিক্রম করে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় ইরানের কুদস বাহিনীর প্রধান কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। এর পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। একই বছরে তেহরান থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি ইউক্রেনীয় যাত্রীবাহী বিমান ভুলবশত ভূপাতিত করে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, এতে ১৭৬ জন নিহত হন।
উত্তরসূরি নিয়ে অনিশ্চয়তা
খামেনির মৃত্যুর পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচন করবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট উত্তরসূরির নাম সামনে আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভূমিকার ওপর। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন।
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের রাজনীতি, সমাজ ও আঞ্চলিক কৌশলে গভীর প্রভাব রেখে গেলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
