আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ঘটছে। ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, বিপুল বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং এআই কৌশল নির্ধারণে আফ্রিকার দেশগুলো এখন মরিয়া হয়ে কাজ করছে। মরক্কোর তানজিহারে সম্প্রতি আফ্রিকান ইউনিয়নের মন্ত্রীদের বৈঠকে বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসে। তবে এই উন্নয়নের চাকচিক্যের নিচে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল এই বিশাল ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর আফ্রিকান দেশগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ কতটা বজায় থাকবে।
এতদিন এআই নিয়ে আলোচনা মূলত এই প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের চেয়ে এর মালিকানা, শাসনব্যবস্থা এবং এআই সিস্টেম পরিচালনার শর্তাবলির দিকে বেশি ঝুঁকছে। নাইজেরিয়া, কেনিয়া, মিশর এবং ঘানার মতো দেশগুলো এরই মধ্যে জাতীয় এআই কৌশল ঘোষণা করেছে, যেখানে স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ঘানা তো সরাসরি এআই প্রযুক্তিকে 'সার্বভৌম সক্ষমতা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
তবে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পদে পদে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে দেশগুলো। দক্ষিণ আফ্রিকায় সম্প্রতি একটি এআই নীতি খসড়া বাতিল করতে হয়েছে, কারণ তাতে এমন কিছু তথ্য ছিল যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এবং যাচাইযোগ্য নয়। বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির ওপর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে এবং এর প্রভাব পড়ছে আফ্রিকার বাজারেও। সিগন্যাল রিস্কের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়াল সিংয়ের মতে, বিশ্ববাজারে এআই শিল্পের খণ্ডিত প্রকৃতি আফ্রিকান দেশগুলোকে দরকষাকষির সুযোগ করে দিচ্ছে।
আফ্রিকায় ডিজিটাল অবকাঠামোর বড় ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৮ শতাংশ আফ্রিকায় বসবাস করলেও বৈশ্বিক ডেটা সেন্টার ক্ষমতার ১ শতাংশেরও কম এই মহাদেশে অবস্থিত। ম্যাকেঞ্জির গবেষণা অনুযায়ী, আফ্রিকার পাঁচটি বৃহত্তম ডেটা সেন্টারের সম্মিলিত ক্ষমতা ফ্রান্সের চেয়েও কম। এর ওপর নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব এই খাতের প্রসারে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।
এই সীমাবদ্ধতার কারণেই কেনিয়ায় মাইক্রোসফট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জি৪২ কোম্পানির প্রস্তাবিত ১ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার প্রকল্পটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো সতর্ক করে বলেছেন, এত বড় অবকাঠামোর জন্য বিশাল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন, যা দেশের জ্বালানি চাহিদার ওপর বাড়তি চাপ ফেলবে। দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক শর্তাবলী নিয়েও দেশটিতে বিতর্ক চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল পশ্চিমা কোম্পানি নয়, বরং বিনিয়োগের উৎসের বহুমুখীকরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটি পশ্চিমা হোক কিংবা চীনা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকারের উচিত উন্নয়নমূলক প্রভাব ও পরিবেশগত প্রভাব বিশ্লেষণ করা। পানি ব্যবহারের আধিক্য এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটিও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। আফ্রোব্যারোমিটারের প্রধান নির্বাহী জোসেফ আসুঙ্কা সতর্ক করে বলেছেন, এআই নিয়ে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আলোচনা হলেও তা সাধারণ মানুষের থেকে দূরে রাখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
আফ্রিকা খুব দ্রুতই এআই প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে—এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের ওপর মহাদেশটিকে দীর্ঘসময় নির্ভর করতে হবে। তবে এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ঠিক কোন শর্তে এবং কতটা জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে এই প্রযুক্তি গ্রহণ করা হবে। ডিজিটাল ভবিষ্যতের এই সন্ধিক্ষণে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই নির্ধারণ করবে আফ্রিকার অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রযুক্তি কতটা নিয়ন্ত্রিত ও কল্যাণকর হবে।