নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের ত্রিমুখী সামরিক জোট গঠন

সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক সম্প্রতি একটি যুগান্তকারী যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নতুন এই নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায়, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হলে তাকে সম্মিলিত আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। ন্যাটো জোটের অনুচ্ছেদ পাঁচের আদলে তৈরি এই চুক্তিটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সামরিক সহযোগিতা গভীর করার পাশাপাশি যৌথ সামরিক মহড়া আয়োজনের পথ প্রশস্ত করবে।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো সামরিক সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। এই ত্রিপক্ষীয় জোটের আওতায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সামরিক বাহিনীর প্রধানদের সমন্বয়ে কৌশলগত রাজনৈতিক ও সামরিক উচ্চপর্যায়ের মেকানিজম তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনির সৌদি আরব সফর শেষে এই চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ পায়। এছাড়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে আলোচনার জন্য রিয়াদ সফর করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনা এবং সংঘাতের আবহে এই জোট গঠন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ন্যাটোর সদস্যভুক্ত দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির অধিকারী তুরস্ক জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই জোটে মিসরের মতো অন্যান্য দেশকেও যুক্ত করার সম্ভাবনা খোলা রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সামরিক চুক্তিগুলো বড় আকারের আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও, ছায়া যুদ্ধ বা প্রক্সি লড়াইয়ের মতো ‘গ্রে জোন’ বা ধূসর এলাকার সংঘাত মোকাবিলায় এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এমন জোট প্রকৃত সম্মিলিত প্রতিরক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক সংহতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বেশি কাজ করে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই ধরনের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির দীর্ঘ অতীত রয়েছে। ১৯৪৯ সালে গঠিত ন্যাটোর অনুচ্ছেদ পাঁচের আওতায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর আক্রমণকে সম্মিলিত আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো থেকে বিরত রেখেছিল। একইভাবে আরব লিগ ১৯৫০ সালে, রিয়ো চুক্তি ১৯৪৮ সালে এবং অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আনজাস (অ্যানজাস) চুক্তি ১৯৫১ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
এই তালিকার বাইরেও বিভিন্ন অঞ্চলে কৌশলগত প্রয়োজনে সামরিক জোট গঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যকার নিরাপত্তা চুক্তি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সমঝোতা দেশ দুটিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতির আইনি ভিত্তি প্রদান করেছে। এছাড়া জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর ‘পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স’ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের লিসবন চুক্তির ৪২.৭ অনুচ্ছেদে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। রাশিয়া নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সিএসটিও একইভাবে তাদের সদস্যদের ওপর আক্রমণকে সম্মিলিত হুমকি হিসেবে গণ্য করে, যা ২০২২ সালে কাজাখস্তানে মোতায়েন করা হয়েছিল। নতুন এই সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষ বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
