হুথিদের সংঘাত ও আঞ্চলিক উত্তজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নতুন সামরিক কৌশল নিচ্ছে সৌদি আরব

ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক আক্রমণ ও তৎপরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর ২০২২ সালে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে এখন গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, চলমান উত্তেজনা ইয়েমেনকে আবারও এক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে পুরো অঞ্চলে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন আল-মাখা বন্দরে ধারাবাহিক হামলা এবং বাব আল-মানদেব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের সাম্প্রতিক আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। ইয়েমেনের কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের হামলায় ছয়জন নিহত এবং দশজন আহত হয়েছেন। এছাড়া ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলে সরকারি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও রকেট হামলায় অন্তত ৩০ জন সেনা নিহত হয়েছেন। হুথিরা সৌদি আরবের আরামকো তেল শোধনাগারেও হামলা চালিয়েছে।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমির মতে, পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার নতুন কোনো দুর্বল যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে রাজি নয়। সাফা নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, হুথি মিলিশিয়াদের কোনো কর্মকাণ্ডই বিনা প্রতিক্রিয়ায় পার পাবে না। তবে তিনি বিদ্রোহীদের অস্ত্র সমর্পণ করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাবে আল-মানদেব প্রণালী দিয়ে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ায় সৌদি আরব তার কৌশল পরিবর্তন করেছে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিয়াদ একটি নতুন আন্তর্জাতিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে, যেখানে তেরোটি দেশ অংশগ্রহণ করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া পাকিস্তান ও তুরস্কের সাথে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ওয়াশিংটনের সাথে সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ রিয়াদের নতুন কৌশলেরই অংশ।
ল্যানকাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবনের মতে, রিয়াদ এখন হুথিদের সাথে আপসের পথ থেকে সরে এসে তাদের উপকূল থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কৌশলে মনোনিবেশ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা এবং ইয়েমেনের ভৌগোলিক বৈরী পরিস্থিতির কারণে কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে তাদের দমন করা কঠিন। তবে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং সামরিক সক্ষমতা অর্জনে তৎপর।
ইয়েমেনের এই নতুন অস্থিরতা কেবল অভ্যন্তরীণ লড়াই নয়, বরং বৃহত্তর মার্কিন-ইরান সংঘাতের একটি প্রতিচ্ছবি। ইরান সমর্থিত হুথিরা নিজেদের লোহিত সাগরের তেল রুটগুলো বন্ধ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে মনে করছে। এমতাবস্থায়, বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে, কোনো বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে এর সবচেয়ে ভয়াবহ মাশুল দিতে হবে সাধারণ ইয়েমেনি নাগরিকদের, যারা ইতোমধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
