রোমের স্পিন টাইম ভবন থেকে উচ্ছেদ তিন শতাধিক বাসিন্দা মানবেতর জীবন যাপন করছেন ফুটপাতে

ইতালির রাজধানী রোমে টার্মিনি স্টেশনের অদূরে অবস্থিত ‘স্পিন টাইম’ নামক একটি বহুতল ভবনকে কেন্দ্র করে মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছেছে। গত ২৯ জুলাই ভবনটিতে একটি ছোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ তিন শতাধিক বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করে ভবনটি সিলগালা করে দেয়। তীব্র দাবদাহের মধ্যে বর্তমানে নারী, শিশুসহ শতাধিক পরিবার ফুটপাতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে ভবনটি ২০টিরও বেশি দেশের প্রায় ১৪০টি পরিবারের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছিল। এখানে বসবাসরত আনা বিজদোয়াকা জানান, গত নয় দিন ধরে তারা ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছেন। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন প্রায় ১০০ শিশুসহ অসহায় বাসিন্দারা। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও সাধারণ মানুষের সহায়তায় কোনোমতে খাদ্য ও পানি জুটলেও মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন তারা।
ভবনটিতে বসবাসরত মারিয়া ক্যাবরেরা বলেন, এটি কেবল একটি ভবন নয়, বরং বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের একটি পরিবার। এখানে একটি কো-ওয়ার্কিং স্পেস, পাঠাগার এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল, যা অনেক নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বিনোদনের সুযোগ তৈরি করেছিল। এই মানবিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ২০২১ সালের নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী জর্জিও পারিসি এক খোলা চিঠিতে সংহতি প্রকাশ করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন, বৈষম্য এবং প্রান্তিকীকরণ গণতন্ত্রের ভিতকে ক্ষয় করছে, তাই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভ্যাটিকান এবং রোমের নগর কর্তৃপক্ষ আলোচনার উদ্যোগ নিলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। রোমের মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি ভবনটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও মালিকপক্ষ ‘ইনভেস্টিরে এসজিআর’ নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আইনি জটিলতার অজুহাতে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। কোম্পানিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই স্থানে একটি বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাসিন্দাদের উচ্ছেদের পেছনে একটি বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ইতালির ডানপন্থী ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ দলের পক্ষ থেকে সরকারি অর্থ ব্যয়ে ভবনটি ক্রয়ের বিরোধিতা করা হয়েছে। তাদের দাবি, এতে অবৈধ দখলদারিত্বকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য একটি ছোট অগ্নিকাণ্ডকে ব্যবহার করে অসহায় পরিবারগুলোকে গৃহহীন করা হয়েছে। প্রশাসনের আশ্বাস অনুযায়ী আগামী ৬০ দিনের মধ্যে যোগ্য পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের কথা বলা হলেও, বাসিন্দারা তাদের আবাসস্থলে ফিরে যাওয়ার দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন।
প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই কমিউনিটি এখন বড় ধরনের উচ্ছেদের হুমকিতে রয়েছে। মারিয়া ক্যাবরেরা আক্ষেপ করে বলেন, দরিদ্র হওয়া কোনো অপরাধ নয় এবং তারা কেবল তাদের ঘর ফিরে পেতে চান। পোপ ফ্রান্সিসও এই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন বলে ভ্যাটিকানের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। ইতালির ইতিহাসে এটি হতে যাচ্ছে অন্যতম বৃহৎ উচ্ছেদের ঘটনা, যা দেশটির আবাসন সংকট ও সামাজিক বৈষম্যের চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
