AdvertisementAdvertisement

মাদক খাইয়ে নারী নির্যাতন ও অনলাইনে প্রচার: বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্বজুড়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে মাদক ব্যবহার করে যৌন নির্যাতনের এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে পুরুষরা একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করছে। আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, এমন অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা তাদের সঙ্গী বা পরিচিত নারীদের পানীয়ের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অচেতন করে তোলে এবং পরে সেই অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে ছবি ও ভিডিও চিত্র ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়।

যুক্তরাজ্যের ডেভনের বাসিন্দা জোয়ি ওয়াটস তার দীর্ঘ ১৬ বছরের দাম্পত্য জীবনে এমনই এক বীভৎস অভিজ্ঞতার শিকার হন। তার প্রাক্তন স্বামী তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার পর নির্যাতনের চিত্র ধারণ করে তা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ২০২২ সালে সেই অপরাধীর ১১ বছরের কারাদণ্ড হয়। এই ঘটনার পর ওয়াটস এবং আরেক ভুক্তভোগী আমান্ডা স্ট্যানহোপ ‘এন্ড আই চেক’ নামে একটি প্রচারণাও শুরু করেছেন। সাধারণত পর্নোগ্রাফির একটি বিকৃত উপশাখা হিসেবে পরিচিত ‘সম্নোফিলিয়া’র নামে অচেতন বা ঘুমন্ত নারীকে কেন্দ্র করে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়, যেখানে অপরাধীরা অনেক সময় ভুক্তভোগীর চোখের পাতা তুলে নিশ্চিত করে যে সে পুরোপুরি অচেতন কি না।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

মনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এমা কোয়ালটির মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং একটি সুসংগঠিত অপরাধ। তিনি জানান, টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং কিছু ওয়েবসাইটকে ব্যবহার করে অপরাধীরা তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, যেখানে গোপনীয়তা বজায় রাখা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন করা সহজ। জার্মানিতে ‘ড্রাইভিং স্কুল’ নামে টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে একদল পুরুষকে নারীদের মাদক খাইয়ে ধর্ষণের দায়ে সাজা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ফ্রান্সের কুখ্যাত জিজেল পেলিকট মামলায় দেখা গেছে, এক নারী দশ বছর ধরে স্বামীর মাধ্যমে শত শত পুরুষের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নথিপত্রে এই অপরাধের বিস্তার সম্পর্কে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। ব্রিটেনের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি প্রায় ২৭০ জন অপরাধীকে চিহ্নিত করেছে, যারা এমন আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে জড়িত। অন্যদিকে ইউরোপোলের ‘প্রজেক্ট মেডুসা’র অনুসন্ধানে আরও ১৫৬ জন অপরাধী ও ভুক্তভোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব চক্রের একেকটি গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ৭০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, স্পেন ও চীনসহ বিশ্বের অন্তত ২২টি দেশ থেকে ভুক্তভোগীরা ওয়াটসের সাথে যোগাযোগ করেছেন, যা এই সংকটের বিশ্বজনীন রূপকে স্পষ্ট করে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধীরা ইন্টারনেটের নামহীনতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের কৃতকর্মের দায়বদ্ধতা থেকে দূরে থাকছে। ভুক্তভোগীরা প্রায়শই তীব্র মানসিক ট্রমা, বিষণ্নতা এবং সামাজিক গ্লানির শিকার হন, কারণ অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা তাদের কাছের মানুষ বা পরিবারের সদস্যই হয়ে থাকে। ওয়াটস আক্ষেপ করে বলেন, বিয়ের সম্পর্কের আড়ালে যে এতটা ভয়াবহ ঝুঁকি থাকতে পারে, তা আগে চিন্তাও করা যায়নি।

এই অপরাধ দমনে আইনি কাঠামোর পরিবর্তন এবং সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এমা কোয়ালটি জোর দিয়ে বলেন, মাদক ব্যবহার করে এই ধরনের যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে আলাদাভাবে পরিসংখ্যানের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া যেসব ওয়েবসাইট বা প্ল্যাটফর্ম এই অপরাধকে উৎসাহিত করে, তাদের মালিকদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসাই এখন সময়ের দাবি। কেবল কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং সামাজিকভাবে ভুক্তভোগীদের ওপর দোষ চাপানোর সংস্কৃতি বন্ধ করলেই এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%