জিম্বাবুয়েতে টেলিমেডিসিন সেবায় প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা

জিম্বাবুয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে টেলিমেডিসিন বা ভার্চুয়াল পরামর্শ সেবা নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ভোগান্তি কমিয়ে এবং ব্যয়সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জিমস্মার্ট ভিলেজেস নামক একটি উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগ কোম্পানি নেটওয়ান এবং জিম্বাবুয়ে পোস্টের সহায়তায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আটত্রিশ বছর বয়সী কৃষক এনিমর কাডজুঙ্গে দীর্ঘ তিন মাস ধরে বুকে ব্যথা ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যায় ভুগছিলেন। কাছের কোনো শহরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দেখা পাওয়া ছিল তার জন্য অত্যন্ত দুরূহ ও ব্যয়বহুল। অবশেষে তার নিজ গ্রাম চিম্বোন্দি থেকে ১৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি নিয়াজুরা টেলিহেলথ সেন্টারে পৌঁছান। সেখানে রক্তচাপ পরীক্ষার পর ভিডিও কলের মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তিনি উচ্চ রক্তচাপের সঠিক ওষুধ পান, যা তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটায়।

জিম্বাবুয়েতে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে জনস্বাস্থ্য খাত ওষুধ ও চিকিৎসক সংকটে জর্জরিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ২০২২ সালে দেশটিতে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১.৭ জন, যা আফ্রিকা মহাদেশের গড় ২.৬ জনের চেয়েও কম। এমন বাস্তবতায় গ্রামীণ রোগীদের চিকিৎসার জন্য অনেক সময় ২২ থেকে ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। যাতায়াত ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে গরু টানা গাড়িতে করে রোগীদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হয়।

২০২৪ সালের মে মাসে যাত্রা শুরু করা এই টেলিহেলথ কেন্দ্রগুলো স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এবং ব্যাকআপ লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎহীনতার সমস্যাও কাটিয়ে উঠেছে। বর্তমানে জিম্বাবুয়ের সাতটি প্রদেশে ২৮টি কেন্দ্র চালু রয়েছে, যেখান থেকে ইতোমধ্যে ২৮ হাজারেরও বেশি ভার্চুয়াল পরামর্শ ও ২৫ হাজার রোগ নির্ণয় পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে সাধারণ রোগীদের ২ থেকে ১০ ডলার খরচে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যেখানে বেসরকারি ক্লিনিকে এই ব্যয় ১৫ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

জিমস্মার্ট ভিলেজেসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তাওয়ান্দা নজেরেরে জানান, ডাকঘরের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই এসব ডিজিটাল হেলথ এক্সেস পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে। প্রাউড চিমেনে নামক আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এই সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকলে তিনি তার ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিতে পারতেন না। বর্তমান সময়ে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যা নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড এবং নিয়মিত ফলোআপ বড় ভূমিকা রাখছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টেলিহেলথ সব সমস্যার সমাধান নয়। চক্ষু চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জটিল রোগ ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও, প্রযুক্তিগত এই উদ্ভাবন সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করছে। এনিমর কাডজুঙ্গের মতো প্রান্তিক মানুষরা আবারও তাদের স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরতে পারছেন, যা এই প্রকল্পের সফলতারই বড় প্রমাণ।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%