নর্থ সি তেল উত্তোলনের উদ্যোগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বিশ্ব, স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র বিরোধ ও বিতর্ক

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম নর্থ সি বা উত্তর সাগরে নতুন করে খনিজ তেল ও গ্যাস উত্তোলনের অনুমতি দেবেন কি না, তা নিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক ও জল্পনা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের উত্তোলনের পক্ষে বার্নহামের সম্ভাব্য অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে একে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একটি ‘আত্মঘাতী’ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করছেন। আল জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি এখন ব্রিটেনের জন্য একটি বড় জলবায়ু পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছে।
শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দা আন্দ্রেয়া সানচেজ কুইরোজের বাড়ি থেকে মাত্র ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের সর্ববৃহৎ অব্যবহৃত তেল ও গ্যাসক্ষেত্র ‘রোজব্যাংক’। সানচেজসহ স্থানীয় আন্দোলনকারীরা মনে করেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা স্থানীয় সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান, বিশেষ করে সুরক্ষিত ফ্যারো-শেটল্যান্ড স্পঞ্জ বেল্টের অপূরণীয় ক্ষতি করবে। ২০২১ সাল থেকে ‘শেটল্যান্ড স্টপ রোজব্যাংক’ আন্দোলনের সাথে যুক্ত সানচেজের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের এই সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নতুন করে বিনিয়োগ করা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।
রোজব্যাংক প্রকল্পের সাথে জড়িয়ে আছে ভূ-রাজনৈতিক জটিলতাও। এই প্রকল্পের অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে ইজরায়েলি জ্বালানি গোষ্ঠী ডেলিক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইথাকা এনার্জি। জাতিসংঘের কালো তালিকাভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানটি অধিকৃত পশ্চিম তীরে বেআইনি বসতি স্থাপনে সহায়তা এবং ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীকে জ্বালানি সরবরাহের দায়ে অভিযুক্ত। স্কটিশ প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইথাকা এনার্জি রোজব্যাংক থেকে যে লভ্যাংশ আয় করবে, তা ইজরায়েলের জেনোসাইড বা গণহত্যার মতো কর্মকাণ্ডকে সরাসরি সহায়তা করবে।
আইনি জটিলতার কারণে ২০২৩ সালে নরওয়েজিয়ান প্রতিষ্ঠান ইকুইনোরকে দেওয়া খননের অনুমতি বাতিল হয়েছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আদালত জানায়, রোজব্যাংক ও শেল কোম্পানির জ্যাকড ডে ফিল্ডের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে বড় ধরনের ত্রুটি ছিল। এরপর নতুন করে প্রভাব মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়, যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন ব্রিটিশ জ্বালানিসচিব মিয়াটা ফানবুলেহ। তবে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট প্রকল্প নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
এদিকে জ্বালানি শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন প্রকল্পের ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ গ্রেগ মাটির মতে, উত্তর সাগরের সিংহভাগ তেলই বিদেশে রপ্তানি করা হয়, ফলে এটি যুক্তরাজ্যের নিজস্ব জ্বালানি সংকট নিরসনে তেমন কোনো ভূমিকা রাখবে না। পরিবেশবাদী সংগঠন আপলিফটের উপ-পরিচালক রবার্ট পামারের ভাষ্যমতে, জীবাশ্ম জ্বালানির পেছনে দৌড়ানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। স্থানীয় শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় এবং তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল টেকসই রূপান্তর সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা