মার্কিন অর্থায়ন হ্রাস: বিশ্বজুড়ে এইডস চিকিৎসায় বিপর্যয় ও লাখো মানুষের জীবন ঝুঁকিতে

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক এইডস সহায়তা কর্মসূচিতে ব্যাপক অর্থায়ন হ্রাসের ফলে বিশ্বজুড়ে এইচআইভি চিকিৎসা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা চরম সংকটের মুখে পড়েছে। এইডস বিষয়ক আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ‘আমফার’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে প্রেসিডেন্টস ইমার্জেন্সি প্ল্যান ফর এইডস রিলিফ বা ‘পেপফার’ তহবিলে কাটছাঁট করায় বহু দেশে জীবন রক্ষাকারী সেবা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সংস্থাটি ৪৬টি দেশের ১৬৬টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখেছে, অর্থসংকটে বাধ্য হয়ে অনেক ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, এই তহবিল হ্রাসের ফলে বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ৭০০টিরও বেশি ক্লিনিক বন্ধ হয়ে গেছে এবং ১৬ হাজারেরও বেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশই যৌনকর্মী, রূপান্তরকামী ব্যক্তি, সমকামী পুরুষ এবং শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের সেবা দেওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। শিশুদের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ভয়াবহভাবে; শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই ‘পেপফার’ সমর্থিত চিকিৎসার আওতা থেকে ৭৭ হাজার শিশু বঞ্চিত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ কম।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এসব তথ্য প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে যে, কৌশলগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘পেপফার’ এখন আরও শক্তিশালী হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের তথ্যে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যদিও গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক তথ্য পর্যালোচনায় এই সংকটের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহভাবে ফুটে উঠবে, যা সাময়িক তথ্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের এইডস বিষয়ক কর্মসূচি ‘ইউএনএইডস’ সতর্ক করেছে যে, যদি এই অর্থায়ন হ্রাস স্থায়ী হয়, তবে ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বে নতুন করে ৬৬ লাখ মানুষ এইচআইভি সংক্রমিত হতে পারে এবং ৪২ লাখ মানুষ এইডসজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করতে পারে। কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোও বৈদেশিক সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট করায় বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

আফ্রিকা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সম্মেলনে অংশ নিয়ে ইউএনএইডস-এর নির্বাহী পরিচালক উইনি বিয়ানিমা এএফপিকে জানিয়েছেন, গত বছর তাদের তহবিলের প্রায় ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তিনি একে ‘আমূল পরিবর্তনের মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, নিজেদের নাগরিকদের জীবন রক্ষার্থে আফ্রিকাকে দ্রুত নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সার্বভৌমত্বের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের হাত ধরে শুরু হওয়া ‘পেপফার’ কর্মসূচি এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ২৬ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে বলে স্বীকৃত, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অর্জিত সাফল্যই এখন হুমকির মুখে পড়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%