ইতালির মোরান্দি সেতু ধস মামলায় সাবেক সিইওসহ ৩২ জনের কারাদণ্ড

ইতালির জেনোয়া শহরে ২০১৮ সালের ভয়াবহ মোরান্দি সেতু ধসের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ৩২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার জেনোয়ার একটি আদালতে এই ঐতিহাসিক রায়ে সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আটলান্টিয়ার সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিওভান্নি কাস্তেলুচ্চিকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মানবসৃষ্ট এই বিপর্যয় ইতালির অবকাঠামো খাতের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, যেখানে ট্র্যাজেডিটিতে ৪৩ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছিল।
আদালত সূত্র ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাস্তেলুচ্চির বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত নরহত্যা ও দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এই মামলায় মোট ৫৭ জন বিবাদীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ চার বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়া চলে। অভিযুক্তদের মধ্যে কোম্পানি নির্বাহী, প্রকৌশলী এবং পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিচারক রায়ে ৩২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন, যার মধ্যে সাজার মেয়াদ ১ বছর ১১ মাস থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। ২৫ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে অথবা আইনি মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
আদালতের রায়ে আটলান্টিয়ার মটরওয়ে ইউনিট ‘অটোসট্রেড পার ইতালিয়া’র সাবেক রক্ষণাবেক্ষণ প্রধান মিকেলি দোনফেরি মিতেলিকে ১১ বছরের এবং প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ‘এসপিইএ’র সাবেক প্রধান নির্বাহী আন্তোনিনো গালাতাকে ৫ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা, যারা দীর্ঘ বছর ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন। কৌঁসুলি ওয়ালতার কোতুগনো এই সেতুটিকে একটি ‘টিকিং টাইম বোমা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শেষ পর্যন্ত ধসে পড়ে।
উল্লেখ্য যে, ১ হাজার ১৮২ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি ১৯৬৭ সালে উদ্বোধন করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে বিশেষজ্ঞরা সেতুটির জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে সতর্কবার্তা দিলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হয়নি। প্রসিকিউটরদের যুক্তি ছিল, মুনাফা বৃদ্ধির আশায় কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সতর্কতা উপেক্ষা করার কারণেই এই বিপর্যয় ঘটে। যদিও বিবাদী পক্ষের দাবি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব নয়, বরং সেতুর নির্মাণশৈলীতে বিদ্যমান গোপন ত্রুটিই এই ধসের মূল কারণ ছিল।
ঘটনার প্রায় ছয় বছর পর আসা এই রায়কে ইতালির ভঙ্গুর অবকাঠামো এবং ধীরগতির বিচার ব্যবস্থার এক প্রতীকী বিজয় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। রায়ের আগের দিন আটলান্টিয়ার বর্তমান সিইও আরিগো জিয়ানা এক বিবৃতিতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তবে এই আইনি নিষ্পত্তি যে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর ক্ষত পুরোপুরি মুছে দিতে পারবে না, তা স্পষ্ট। ইতালির জনগণের কাছে মোরান্দি সেতু ধস কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং দায়িত্বশীলদের অবহেলার এক চরম নিদর্শন হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা