হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিতে নতুন আইনের পথে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন এক পরিকল্পনা উত্থাপন করেছে ইরানের কট্টরপন্থী সংসদ সদস্যরা। দীর্ঘ পাঁচ মাসের অচলাবস্থা কাটিয়ে পার্লামেন্টের অধিবেশন পুনরায় শুরুর পরপরই এই বিতর্কিত পদক্ষেপটি নেওয়া হলো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় এই কৌশলগত জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত এক অঘোষিত সংসদীয় অধিবেশনে আইনপ্রণেতারা শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ নিহত কর্মকর্তাদের স্মরণে প্রতিশোধের প্রতীকী লাল পতাকা প্রদর্শন করেন। এ সময় ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাকশন ফর দ্য সিকিউরিটি অ্যান্ড সাসটেইনেবল প্রগ্রেস অব দ্য স্ট্রেইট অব হরমুজ অ্যান্ড দ্য পারস্য উপসাগর’ শীর্ষক একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বার্তায় জানিয়েছেন, প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত করা এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ মাত্র এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
যদিও প্রস্তাবিত খসড়াটির পূর্ণাঙ্গ বয়ান এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে এর মূল উদ্দেশ্য হলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো ধরণের কূটনৈতিক আলোচনার পথ রুদ্ধ করা। মে মাসে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া খসড়া অনুযায়ী, এই আইনে মার্কিন বা ইসরায়েলি পতাকাবাহী জাহাজসহ তেহরানবিরোধী যেকোনো দেশের সামরিক ও গোয়েন্দা নৌযান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া সব বাণিজ্যিক জাহাজকে পারস্য উপসাগর নামটি ব্যবহার করা, মালামালের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া এবং নির্দিষ্ট হারে মাশুল প্রদান বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। আইন লঙ্ঘন করলে মোট পণ্যের ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করে সেই অর্থ ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত পুনর্গঠনে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালীর নতুন ‘অভিভাবক’ হিসেবে জাহাজের মালামালের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি পাল্টা মন্তব্য করেছেন যে, মাশুলের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিলেও তেহরান তুলনামূলক কম ও ন্যায়সংগত ফি নির্ধারণের মাধ্যমে প্রণালীর চিরস্থায়ী অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সহায়তায় বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছে তেহরান।
গত এক সপ্তাহে ইরানের ১১টি প্রদেশে কয়েকশ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী, যাতে অন্তত ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বন্দর আব্বাসসহ হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন এলাকাগুলোতে হামলার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। এর জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ওমান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিতে আলোচনা শুরুর চেষ্টা চললেও পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে প্রতিনিয়ত।
সংঘাতের এই প্রভাব পড়েছে ইরানের অর্থনৈতিক বাজারেও। মঙ্গলবার তেহরানের উন্মুক্ত বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান কমে ১.৮৫ মিলিয়ন রিয়ালে দাঁড়িয়েছে, যা গত মে মাসের রেকর্ড ১৯ লাখ রিয়ালের কাছাকাছি। একই সঙ্গে তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ৪২ হাজার পয়েন্ট হারিয়ে ৫০ লাখ পয়েন্টের নিচে নেমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নৌ-অবরোধ পুনরায় কার্যকর এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের ফলে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের পথে এগোচ্ছে ইরান।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা