কাতার আধুনিক রূপকার শেখ হামাদ বিন খলিফা আল সানির প্রয়াণ

কাতারের আধুনিক রূপকার এবং দেশটির সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ৭৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ১৯৯৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ বছর তিনি কাতার শাসন করেছেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের ওপর ভর করেই ক্ষুদ্র এই উপসাগরীয় দেশটি বিশ্বমঞ্চে এক প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। কাতারের রাজকীয় কার্যালয় আমিরি দিওয়ানের তথ্যানুযায়ী, তাকে আধুনিক কাতারের স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে দোহায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ হামাদ। যুক্তরাজ্যের স্যান্ডহার্স্ট রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি কাতার সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেন এবং মেজর জেনারেল পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। দীর্ঘ সামরিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পর ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ২০১৩ সালের ২৫ জুন নিজ পুত্র শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
তার শাসনকালে কাতারের অর্থনীতি অভাবনীয় গতি অর্জন করে। প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডার ‘নর্থ ফিল্ড’-এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করেন। পরিসংখ্যান বলছে, তার শাসনামলে দেশটির জিডিপি ২৪ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে কাতার বিশ্বের এলএনজি বাজারের ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা মূলত শেখ হামাদের নেওয়া সাহসী অর্থনৈতিক কৌশলেরই ফসল।
অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কারে বিশেষ গুরুত্ব দেন। ২০০১ সালে সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি আয়ের উৎস বহুমুখী করার উদ্যোগ নেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি আরব বিশ্বের গণমাধ্যম জগতে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। ১৯৯৫ সালে কাতার ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সামাজিক উন্নয়নে মাইলফলক স্থাপন করেন।
রাজনীতি ও কূটনীতিতেও শেখ হামাদ ছিলেন সমান পারদর্শী। ১৯৯৯ সালে তিনি পৌর নির্বাচনের প্রবর্তন করেন, যেখানে নারীদের ভোটাধিকার এবং প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। ২০০৪ সালে কাতারের প্রথম স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন এবং ‘কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০’ গ্রহণ ছিল তার আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এছাড়া ইরিত্রিয়া-ইয়েমেন দ্বন্দ্ব, লেবাননের রাজনৈতিক সংকট এবং দারফুর শান্তি প্রক্রিয়াসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন সংঘাত নিরসনে তিনি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাতারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তিনি খেলাধুলাকে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২২ সালে কাতারে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানাতে ২০১২ সালে তিনি গাজা সফর করেন এবং সেখানে অবকাঠামো উন্নয়নে ৪০ কোটি ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। তার প্রয়াণে কাতার এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সমাপ্তি দেখল।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা