ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় কোণঠাসা রাশিয়া বাড়ছে জ্বালানি সংকট ও জনঅসন্তোষ

ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলার মুখে রাশিয়ার শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব দীর্ঘ সময় ধরে নীরবতা বজায় রাখায় ক্রেমলিনের অন্দরমহলে বড় ধরনের অস্থিরতা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রায় প্রতিদিনের সফল ড্রোন হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি শোধনাগার ও তেল ডিপোগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার ফলে দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে যন্ত্রাংশের দুষ্প্রাপ্যতা ও জ্বালানির নিম্নমান রাশিয়ার পরিবহন খাতকে অচল করে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

মস্কোর রাস্তায় ট্যাক্সি চালক আনাতোলি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, নিম্নমানের জ্বালানির কারণে তার গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পথে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর এই কৌশলগত আক্রমণকে তিনি ‘সরাসরি দরজায় লাথি মারার মতো’ উল্লেখ করে বলেন, ক্রেমলিনের সামরিক ভুল সিদ্ধান্তের দায় এখন সাধারণ মানুষকেই চড়া মূল্যে চোকাতে হচ্ছে। রাশিয়ার সামরিক ব্লগাররাও বর্তমান পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে জানিয়েছেন, ইউক্রেনের অপ্রতিসম ড্রোন যুদ্ধের গতির কাছে রাশিয়া প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়ছে।

পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, রাশিয়ার কট্টরপন্থী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ভ্লাদিমির সলোভিভও এখন আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তুলা থেকে এক মা জানান, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তার ছেলে যুদ্ধে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন, অথচ পরিস্থিতি সামলাতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। জনগণের এই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের বিপরীতে পুতিন নিজে গত ২৮ জুন স্বীকার করেছেন যে, ড্রোন হামলাগুলো রাশিয়ার জন্য বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে, যদিও তিনি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণকে ‘নিয়ন্ত্রণের মধ্যে’ বলে দাবি করেছেন।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া বর্তমানে যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে পুতিনের ভুল কৌশল ও প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি। জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন জানান, রাশিয়া মূলত দূরপাল্লার মিসাইল বা ইরানীয় প্রযুক্তির শাহেদ ড্রোনের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা ইউক্রেনের কৌশলগত হামলার বিরুদ্ধে অকার্যকর। ইউক্রেনের ড্রোনগুলো মোকাবিলায় যে ধরনের পান্তসির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন, তার তীব্র অভাব রয়েছে দেশটিতে। মিত্রোখিনের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ও ব্ল্যাক সি উপকূল সুরক্ষিত রাখতে অন্তত ৬ হাজার পান্তসির ইউনিটের প্রয়োজন, যা সরবরাহ করা রাশিয়ার জন্য আপাতত অসম্ভব।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে রাশিয়ার অব্যাহত মিসাইল হামলা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার কিয়েভের কেন্দ্রস্থলে রাশিয়ার ইস্কান্দার মিসাইল হামলায় সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস হলেও ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধের মনোবল ভাঙা সম্ভব হয়নি। ওয়াশিংটনের জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক পাভেল লুজিনের মতে, রাশিয়ার এই কঠোর ও আমলাতান্ত্রিক সামরিক কাঠামো ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক ও বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা কৌশলের কাছে মার খাচ্ছে। সব মিলিয়ে, রাশিয়ার এই সামগ্রিক দুর্বলতা তাদের যুদ্ধের মাঠের পরাজয় ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%