বিশ্বকাপ ব্যর্থতার দায় নিতে রাজি নন নাখেলসমান: বলি করা হচ্ছে দেনিজ উন্দাভকে

ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্যারাগুয়ের কাছে পরাজয়ের পর টানা তৃতীয়বারের মতো গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে জার্মানি। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি মাঠের ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পরিবর্তে আবারও নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ‘বলির পাঁঠা’ খোঁজার সংস্কৃতিতে ফিরে গেছে। এবার কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমানের নিশানায় পড়েছেন কুর্দি ও ইয়াজিদি বংশোদ্ভূত স্ট্রাইকার দেনিজ উন্দাভ।
আট বছর আগে রাশিয়া বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর মেসুত ওজিল ও ইলকায় গুন্দোয়ানকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তায়িপ এরদোয়ানের সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনাকে পুঁজি করে তৎকালীন ফুটবল ফেডারেশন ও উগ্রপন্থী মহলের সমালোচনার মুখে ওজিল আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিতে বাধ্য হন। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি যেন আবারও দেখা যাচ্ছে উন্দাভের ক্ষেত্রে। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হারের পর নাগেলসমান প্রকাশ্যে উন্দাভের পারফরম্যান্সের সমালোচনা করে খেলার মাঠের কৌশলগত ব্যর্থতা আড়ালের চেষ্টা করেছেন।
জার্মান কোচের এমন আচরণ নতুন নয়। মার্চ মাসে ঘানার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে উন্দাভ জয়সূচক গোল করার পরও নাগেলসমান তার ফিটনেস ও খেলার ধরন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে তিনি দুঃখপ্রকাশ করতে বাধ্য হন। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে উন্দাভ দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে তার জোড়া গোল এবং আসরের প্রথম দুই ম্যাচে পাঁচটি গোলে সরাসরি অবদান না থাকলে জার্মানি হয়তো আরও আগেই ছিটকে পড়ত।
জার্মান ফুটবলের এই সংকট কেবল খেলোয়াড় নির্বাচনে সীমাবদ্ধ নয়। একসময় যারা যুব একাডেমি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব শাসন করেছে, সেই জার্মানি এখন তথ্য ও পরিসংখ্যাননির্ভর ‘ল্যাপটপ কোচিং’-এর গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছে। পেশাদার ফুটবলার না হওয়া নাগেলসমানের কৌশল ও খেলোয়াড়দের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানোর প্রবণতা দলের ভারসাম্য নষ্ট করেছে। বিশেষ করে পেনাল্টি শুটআউটে অভূতপূর্ব ব্যর্থতা দলটির মানসিক দৃঢ়তার ঘাটতিকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
উন্দাভের উত্থান কোনো সুসংগঠিত একাডেমির ফসল নয়, বরং এটি কঠোর শ্রম ও সংগ্রামের গল্প। জার্মানির তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের লিগে ১৬৩ ম্যাচে ১০৪ গোলে সরাসরি অবদান রাখার পরও মূলধারার ক্লাবগুলো তাকে উপেক্ষা করেছিল। পরবর্তীতে বেলজিয়াম ও প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ অ্যালবিয়নের হয়ে নিজেকে প্রমাণ করে জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ৭ মিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে প্রিমিয়ার লিগে পাড়ি জমানো এই স্ট্রাইকার যখন কঠিন সত্য উচ্চারণ করেন, তখন কোচ তাকে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দেন।
উন্দাভের বয়স এখন প্রায় ৩০। পরবর্তী বিশ্বকাপে তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে জার্মান ফুটবলের নীতিনির্ধারকরা যদি অদূর ভবিষ্যতে সাফল্যের দেখা পেতে চান, তবে তাদের বুঝতে হবে কেন উন্দাভের মতো প্রতিভারা একাডেমির গণ্ডি পেরিয়ে আসতে পারছে না। কেবল খেলোয়াড়দের ওপর দোষ চাপিয়ে দায় এড়ানোর অভ্যাস বদলে কাঠামোগত সংস্কারই হতে পারে তাদের সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা