কে-পপ মডেল অনুসরণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দেশীয় সংগীতের পুনর্জাগরণ

দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় সংগীত ধারা ‘কে-পপ’-এর অভাবনীয় বিশ্বজয়ের পথ ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এখন নিজস্ব সংগীতের সুর খুঁজে পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে স্থানীয় পপ সংগীতের জোয়ার বইছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংগীতের পাশাপাশি নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির মিশেলে শিল্পীরা নিজেদের স্বকীয়তা তুলে ধরছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বিশ্বমঞ্চে এশীয় সংগীতের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এই অঞ্চলের তরুণ সংগীতশিল্পীরা তাদের শিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন।
ফিলিপাইনের বাসিন্দা জেসার বাজো জানান, কয়েক বছর আগেও তার প্লে-লিস্টে পশ্চিমা গানের আধিপত্য ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে চিত্র বদলে গেছে; এখন সেখানে ফিলিপিনো পপ বা ‘পি-পপ’ গানের জয়জয়কার। আলামাত, বিজিওয়াইও এবং বিনি-র মতো ব্যান্ডগুলো এখন শ্রোতাদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। বিশেষ করে ‘বিনি’ গত এপ্রিলে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংগীত উৎসব কোচেলায় পারফর্ম করে ফিলিপাইনের সংগীত ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। ২০২১ সালে আত্মপ্রকাশ করা এই ব্যান্ডগুলো কে-পপ বা জে-পপের কাঠামোর সাথে দেশীয় সুর ও ভাষার চমৎকার সমন্বয় ঘটাচ্ছে।
সাউন্ডচার্টসের তথ্য অনুযায়ী, রেডিওর সাপ্তাহিক শীর্ষ ১০ গানের তালিকায় স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় এই হার ২৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, থাইল্যান্ডে তা ৩৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৫ শতাংশ। থাই চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংগীত প্রযোজক কড সাত্রুসায়েংয়ের মতে, বিগত পাঁচ বছরে থাই সংগীত তার অনুকরণী চরিত্র কাটিয়ে নিজস্ব পরিচয়ে বিকশিত হচ্ছে। ইয়াংওহম, মিল্লি এবং জোয়ি ফুওয়াসিতের মতো শিল্পীরা পশ্চিমা বা কোরিয়ান ধারার বাইরে গিয়ে নিজস্ব স্বকীয়তা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
কে-পপের বিশ্বব্যাপী সাফল্য এই অঞ্চলের সংগীতশিল্পীদের জন্য একটি আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি ও পর্যটন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে কে-পপ শিল্প বিদেশ থেকে ৮৯৩ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এই বাণিজ্যিক সাফল্য দেখে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্টুডিওগুলো এবং স্বাধীন শিল্পীরা উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্থানীয় সংগীতের ব্যাপক বাজার রয়েছে। এর ফলে থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে ডিজিটাল সংগীতের রাজস্ব ১২২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৪ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম টিকটক এবং ইনস্টাগ্রাম এই সংগীত বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছে। ফিলিপাইনের ব্যান্ড বিজিওয়াইও-র সদস্যরা জানিয়েছেন, ভক্তদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা এবং স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর মাধ্যমে গান ছড়িয়ে দেওয়া তাদের কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষক মেরি এইন্সলি মনে করেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান ক্রয়ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এই সংগীতের প্রসারে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের চাহিদার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়েই এই নতুন সংগীত ধারার উদ্ভাবন ঘটছে।
তবে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন, যেখানে এখনো পশ্চিমা ও কে-পপের আধিপত্য রয়ে গেছে। তবুও ইন্দোনেশীয় শিল্পীদের জনপ্রিয় গানগুলো এই দেশগুলোর সীমানা ছাড়িয়ে সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিচ্ছে। বিশেষ করে ‘নো না’-র মতো গার্ল গ্রুপগুলো ইন্দোনেশীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী সুর ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করে প্রবাসীদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা আজ এই অঞ্চলের শিল্পীদের জন্য এক বিশাল অর্জনে পরিণত হয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা