ইসরায়েল-সোমালিল্যান্ড কৌশলগত মৈত্রী ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ

জেরুজালেমে সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহি সিলাকে রাজকীয় মর্যাদায় বরণ করে নিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতিহীন এই ভূখণ্ডটির কোনো নেতার জন্য এমন রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা অত্যন্ত বিরল। ছয় মাস আগে ইসরায়েল বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এটিই ছিল দেশটির প্রেসিডেন্টের প্রথম সরকারি সফর। এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
সফরের মূল লক্ষ্য ছিল উভয় পক্ষের মধ্যে নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করা। জেরুজালেমে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি আবদুল্লাহি ইসরায়েলি সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। এই সফরের অংশ হিসেবে পশ্চিম জেরুজালেমে সোমালিল্যান্ড তাদের দূতাবাস উদ্বোধন করেছে। বেশিরভাগ রাষ্ট্র জেরুজালেমের বিতর্কিত অবস্থানের কারণে তেল আবিবে দূতাবাস রাখলেও সোমালিল্যান্ডের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় তুলেছে।
ইসরায়েলের জন্য এই সম্পর্ক কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতে লিপ্ত থাকা ইসরায়েলের নজর এখন লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব প্রণালীর দিকে। সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা উপকূলীয় অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েল লোহিত সাগরে নিজেদের নিরাপত্তা বেষ্টনী মজবুত করতে চাইছে। যদিও সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা সরাসরি নিশ্চিত করেননি, তবে তিনি সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এই কূটনৈতিক মিত্রতা নিয়ে সোমালিয়ার সরকারের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। সোমালিয়ার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আলি ওমর সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে এই সম্পর্ক পুরো অঞ্চলকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এমনকি সোমালিল্যান্ডের অভ্যন্তরেও এই সিদ্ধান্তের বিরোধী কণ্ঠস্বর উঠেছে। দেশটির ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিবিদদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, ইসরায়েলের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের দেশটিকে আঞ্চলিক অস্থিরতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।
ফিলিস্তিন, আরব লিগ এবং অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা কাটাতে নেতানিয়াহু এই সম্পর্ককে একটি নতুন পথ হিসেবে দেখছেন। তবে চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, এই কূটনৈতিক আয়োজন বড় ধরনের প্রতীকী গুরুত্ব বহন করলেও এটি অঞ্চলের প্রকৃত সমস্যাগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহি এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থেকেও নিজের দেশের স্বীকৃতির লড়াইয়ে ইসরায়েলকে বড় সহায়তাকারী হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, বিগত ৩৫ বছর ধরে তারা বিশ্বের স্বীকৃতির অপেক্ষায় ছিলেন, যেখানে ইসরায়েল সবার আগে এগিয়ে এসেছে। যদিও এখন পর্যন্ত অন্য কোনো দেশ সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতি প্রদানের পথে হাঁটেনি, তবুও দুই পক্ষই তাদের এই কৌশলগত বোঝাপড়াকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা