AdvertisementAdvertisement

ইরানে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির কবলে জনজীবন

ইরানের রাজধানী তেহরানের ব্যস্ততম বাস্তান বাজারে এখন আর আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই। নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম সাধারণ মানুষের জীবনের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছর আগে যে চালের কেজি ছিল ১৮ লক্ষ রিয়াল, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ লক্ষ রিয়ালেরও বেশি। একইভাবে রান্নার তেলের দাম ৭ লক্ষ রিয়াল থেকে লাফিয়ে পৌঁছেছে ৩০ লক্ষ রিয়ালের ঘরে। ষাটোর্ধ্ব অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী মাশহাদি ফিরুজ আক্ষেপ করে বলেন, তার পেনশনের অর্থ দিয়ে এখন সংসারের তিন ভাগের এক ভাগ খরচও মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

বাজারের চিত্র এখন অনেকটা গোয়েন্দা অভিযানের মতো, যেখানে ক্রেতারা সাশ্রয়ী পণ্যের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। ৪৬ বছর বয়সী গৃহিণী ফাতেমা জানান, আগে সপ্তাহে একবার বাজারে এলেও এখন দামের অস্থিরতা সামলাতে তাকে তিনবার ছুটতে হয়। তার ভাষ্যমতে, লাল মাংস এখন বিলাসিতা, মুরগির মাংস মাঝেমধ্যে টেবিলে অতিথি হয়ে আসে এবং ডিম কেনার সময়ও এখন গুনতে হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতির এই ঢেউ সাধারণ মানুষের জন্য এক অভিশপ্ত মহামারীতে পরিণত হয়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

খুচরা বাজারের মতো পাইকারি বাজারেও স্থবিরতা বিরাজ করছে। তেহরানের নারেনজ এলাকার ব্যবসায়ী মেহরান জানান, গত ৪০ বছরের কর্মজীবনে তিনি এমন অর্থনৈতিক মন্দা দেখেননি। গত চার মাসে পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে দোকান। ব্যবসায়ীরা এখন মুনাফার কথা ভাবছেন না, বরং পৈতৃক ব্যবসাটি টিকিয়ে রাখাই তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস পর্যন্ত বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৭৭.২ শতাংশে, যা ১৯৪২ সালের পর সর্বোচ্চ। তেহরান চেম্বার অব কমার্সের প্রধান আরমান খালেখি এই পরিস্থিতিকে ‘নিখুঁত অর্থনৈতিক ঝড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, ভর্তুকি হ্রাস, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, আঞ্চলিক যুদ্ধ, মজুরি বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক অবরোধ—এই পাঁচটি কারণ একসঙ্গে ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বিশেষ করে পণ্য পরিবহনে সমুদ্রপথে কড়াকড়ি এবং বিকল্প ব্যয়বহুল স্থলপথ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পেট্রোডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ইরানের কাঠামোগত দুর্বলতাকে আড়াল করে রেখেছিল। এখন সেই তেলের প্রভাব কমে যাওয়ায় দীর্ঘদিনের জমানো অর্থনৈতিক ক্ষতগুলো একে একে বেরিয়ে আসছে। তেহরানের তাজরিশ স্কয়ারের ব্যবসায়ী রেজা বলেন, বাজার দেখতে এখন জনাকীর্ণ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি মৃতপ্রায়। মানুষ এখন কেনাকাটার চেয়ে বিনোদনের খোঁজে বাজারে ঘোরে, যা দেশটির অর্থনীতির চরম দুর্দশারই বহিঃপ্রকাশ। অর্থনীতির এই জটিল সমীকরণে সাধারণ নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং রাষ্ট্রীয় আয়ও সংকুচিত হচ্ছে, যা দেশটিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%