ক্রিকেটের নতুন যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পাল্টে দিচ্ছে খেলার দৃশ্যপট

নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের শান্ত পরিবেশে দুই ক্রিকেটপ্রেমীর হাঁটাচলা যে ক্রিকেটের প্রযুক্তিগত বিবর্তনে এক নতুন যুগের সূচনা করবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। আনন্দ রাজারামন এবং বিশাল মিশ্র—এই দুই স্বপ্নদ্রষ্টার মস্তিষ্কপ্রসূত উদ্ভাবন ‘এসএফইউ এআই’ এখন ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণকে নিয়ে গেছে এক ভিন্ন উচ্চতায়। সান ফ্রান্সিসকো ইউনিকর্নসের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত প্রকল্পটি কেবল পরিসংখ্যানের হিসাব মেলাচ্ছে না, বরং খেলার প্রতিটি মুহূর্তকে এক ‘ডিজিটাল টুইন’ বা কৃত্রিম প্রতিচ্ছবিতে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে প্রথাগত সব প্রেডিক্টর যখন পাকিস্তানকে ৯৫ শতাংশ জেতার সুযোগ দিচ্ছিল, তখন এসএফইউ এআই দাবি করেছিল ভারত সমানে সমান লড়াইয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্য প্রমাণিত হয়। বিশাল মিশ্রের মতে, এই প্রযুক্তির মূল শক্তি হলো ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে বর্তমান পরিস্থিতির ডিজিটাল সিমুলেশন তৈরি করা। এটি কেবল জয়-পরাজয়ের পূর্বাভাস নয়, বরং ড্রাফট স্ট্র্যাটেজি, প্রি-গেম পরিকল্পনা এবং ম্যাচের ভেতরে কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছে। কোনো দলের দুর্বলতা খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে কোন খেলোয়াড়কে দলে নিলে জয়ের সম্ভাবনা কতটুকু বাড়বে, তা নিখুঁতভাবে জানাতে সক্ষম এই প্ল্যাটফর্ম। আইপিএল ২০২৬-এ বৈভব সূর্যবংশীর পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে এসএফইউ এআই দেখিয়েছিল, তার গড় ডেল্টা উইন পার্সেন্টেজ ২২ শতাংশ, যা অন্য খেলোয়াড়দের তুলনায় আকাশচুম্বী। ক্রিকেট লেন্স নামের একটি ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্টারফেসের মাধ্যমে কোচরা এখন সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে কথা বলে ভিডিও ফুটেজ বা ফিল্ড প্লেসমেন্টের খুঁটিনাটি তথ্য মুহূর্তেই পেয়ে যাচ্ছেন।
ফিল্ড প্লেসমেন্টের ক্ষেত্রেও এটি দেখিয়েছে অসাধারণ দক্ষতা। রোহিত শর্মা কিংবা নিকোলাস পুরানের মতো ব্যাটারদের জন্য কোন বিশেষ জায়গায় ফিল্ডার থাকলে উইকেট পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তা আইপিএলের আগেই চিহ্নিত করেছিল এই সিস্টেম। মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি আর ক্রিকেটারের মানসিক অবস্থার মতো সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আজও এই প্রযুক্তির বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ মানুষের আবেগকে পুরোপুরি ডেটায় রূপান্তর করা প্রায় অসম্ভব। তবে অভিজ্ঞ স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের সাথে সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা মিশ্রকে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার রসদ জোগাচ্ছে।
ক্রিকেটের আধুনিকায়নে বিশাল মিশ্র নব্বইয়ের দশকে ক্রিকইনফোর সূচনালগ্নে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। আজ তিনি এসএফইউ এআই এবং অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের মেধার সমন্বয়ে ক্রিকেটকে নিয়ে যাচ্ছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক নতুন দিগন্তে। মাঠের ভেতরের এবং বাইরের প্রতিটি সূক্ষ্ম হিসাব মেলানোর এই প্রয়াস নিশ্চিতভাবেই বিশ্ব ক্রিকেটের কৌশলগত মানচিত্র চিরতরে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।