আলোর আড়ালে থাকা ভারতের অবিসংবাদিত ভরসা দীপ্তি শর্মার অসামান্য উত্থানকথা

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে তবলাকে সাধারণত মূল শিল্পীর অনুষঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা মূল গায়কের কণ্ঠকে প্রাণবন্ত করে তোলে। ক্রিকেটের দুনিয়াতেও অফস্পিন অলরাউন্ডারদের ভূমিকা অনেকটা তেমনই—অপরিহার্য কিন্তু অনেক সময়ই আড়ালে থাকা এক চরিত্র। তবে ভারতীয় নারী ক্রিকেটের দীপ্তি শর্মা এই প্রথা ভেঙে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক নির্ভরযোগ্য তারকায়। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক সানা মির ২০১৭ সালে যখন প্রথম ১৯ বছর বয়সী দীপ্তিকে দেখেন, তখনই বুঝেছিলেন এই কিশোরীর মধ্যে আন্তর্জাতিক মঞ্চ কাঁপানোর মতো পরিপক্বতা রয়েছে। সানা মীরের সেই ধারণা ভুল ছিল না, বরং সময়ের পরিক্রমায় দীপ্তি আজ বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডারে পরিণত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়লেও, হারমানপ্রীত কৌর বা স্মৃতি মান্ধানার মতো গ্ল্যামারের কেন্দ্রবিন্দুতে দীপ্তি সেভাবে উঠে আসেননি। তবে মাঠের ভেতরে তার গুরুত্ব অপরিসীম। বিসিসিআই আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে হারমানপ্রীত কৌরকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল যে চাপের মুহূর্তে শেষ ওভারের বলটি তিনি কার হাতে তুলে দেবেন, হারমানপ্রীতের উত্তর ছিল একটাই—’দীপ্তি’। কোচ আমোল মুজুমদারও তাকে তুলনা করেছেন বেন স্টোকসের সাথে, তার কঠোর পরিশ্রম এবং ম্যাচ জেতানোর মানসিকতার কারণে।
দীপ্তির বোলিংয়ে বড় কোনো জাদুকরী টার্ন বা ড্রাইভ হয়তো থাকে না, কিন্তু তার নিখুঁত লাইন-লেংথ এবং গতির ভিন্নতা ব্যাটারদের বারবার পরীক্ষায় ফেলে। ৮৪ কিলোমিটার গতির ডেলিভারি থেকে ৬৯ কিলোমিটারের স্লোয়ারে নামিয়ে আনার দক্ষতা তাকে অনন্য করে তুলেছে। তবে তার ক্যারিয়ার শুধুই সফলতার গল্প নয়। কখনো কখনো রান রেট ধরে রাখা বা কঠিন মুহূর্তে দ্রুত রান তুলতে গিয়ে তাকে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে। কিন্তু নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং প্রতিনিয়ত উন্নতির নেশাই তাকে আজকের উচ্চতায় নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ২০২২ সাল থেকে তিনি নারী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিদের তালিকায় নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেছেন।
ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রেও দীপ্তি একজন আস্থার নাম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৪ হাজারেরও বেশি রান করা এই অলরাউন্ডার ব্যাটিং অর্ডারের যেকোনো জায়গায় নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে ভারতীয় ব্যাটারদের মধ্যে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসটি তার নামের পাশে। তবে আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দ্রুতলয়ের সাথে তাল মিলিয়ে পাওয়ারপ্লে কিংবা ডেথ ওভারে পাওয়ার হিটিংয়ে উন্নতির জায়গা এখনো রয়ে গেছে। আটাশ বছর বয়সী দীপ্তির সামনে নিজেকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এখনো অবারিত।
মাঠের পারফরম্যান্সের বাইরেও এক অন্য দীপ্তিকে দেখা যায়, যে লাইমলাইটের চেয়ে নিজের কাজকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এক সংবাদ সম্মেলনের দিনে যখন একের পর এক প্রশ্নের মুখে তিনি ক্লান্ত, তখন তার সরল স্বীকারোক্তি ছিল—সবাই প্রশ্ন করছে, কিন্তু কেউ একবারও জিজ্ঞেস করল না আমি খেয়েছি কি না। আসলে, দলের জন্য অপরিহার্য এই অলরাউন্ডারের অবদান অনেক সময় পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। তবুও ভারতীয় দলের বিশ্বজয়ের পথে দীপ্তি শর্মা এক অবিচ্ছেদ্য শক্তি হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন নিরলসভাবে।