২০২৬ আইপিএল এলিমিনেটরে বৈভব সূর্যবংশীর রুদ্ররূপ, যেভাবে গুঁড়িয়ে দিলেন প্যাট কামিন্স ও হায়দরাবাদকে

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) প্লে-অফের মতো মহা-চাপের ম্যাচে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ক্রিকেট বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিলেন বৈভব সূর্যবংশী। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের বিশ্বজয়ী অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের বোলিং লাইন-আপকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে মাত্র ২৯ বলে ৯৭ রানের এক টর্নেডো ইনিংস খেলেছেন রাজস্থান রয়্যালসের এই বিস্ময়বালক। নিউ চণ্ডীগড় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে তাঁর এই বিধ্বংসী ব্যাটিং কেবল দলের জয়ই নিশ্চিত করেনি, বরং বিশ্ব ক্রিকেটে এক নতুন মহাতারকার আবির্ভাবের বার্তা দিয়েছে।
ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই স্টেডিয়ামের বাইরে বিহার থেকে আসা ভক্তদের মুখে ছিল কেবলই সূর্যবংশীর নাম। গোলাপী আর নীল রঙের ৩ নম্বর জার্সি গায়ে জড়িয়ে স্টেডিয়ামের বাইরে ভিড় জমিয়েছিলেন আবালবৃদ্ধবনিতা। বিহারের এই কিশোর কীভাবে আইপিএল তথা আধুনিক ক্রিকেটের ব্যাকরণ বদলে দিচ্ছেন, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। বয়সের গণ্ডি, প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি আর অভিজ্ঞতার অহংকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বৈভব যেন এক মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলেছেন ক্রিকেটের আঙিনায়।
অভিজ্ঞতা বা প্রতিপক্ষের নাম নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত ছিলেন না এই কিশোর বাঁহাতি ব্যাটার। টস জিতে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্যাট কামিন্সের প্রথম ওভারের শেষ বলেই গায়ের জোরে মাথার ওপর দিয়ে বাউন্ডারির বাইরে আছড়ে ফেলেন বৈভব। পরের ওভারে এশান মালিঙ্গার বাউন্সারকে সীমানা পার করে বুঝিয়ে দেন, আজ তিনি কোনো হিসেব মেলাতে আসেননি। এরপর কামিন্সের এক ওভারেই ২৫ রান তুলে নিয়ে অস্ট্রেলীয় অধিনায়ককে দিশেহারা করে দেন এই তরুণ তুর্কি। একের পর এক ফিল্ডিং পরিবর্তন করেও বৈভবের তাণ্ডব থামাতে ব্যর্থ হন কামিন্স।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইনিংসের এক পর্যায়ে মাত্র ১০ বলের ব্যবধানে ৬টি বিশাল ছক্কা হাঁকান বৈভব সূর্যবংশী। পাওয়ারপ্লে শেষ হওয়ার সময় তাঁর সংগ্রহ ছিল ২০ বলে ৬০ রান, যা পরবর্তী ৯ বলে আরও ৩৭ রান যোগ করে শেষ পর্যন্ত ২৯ বলে ৯৭ রানে গিয়ে দাঁড়ায়। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ব্যাটার ক্রিস গেইলের চেয়েও বৈভবের ছক্কা মারার অনুপাত এখন সেরা। প্রতি ৪.৩ বলে একটি করে ছক্কা মেরে তিনি আইপিএল ইতিহাসের সব রেকর্ড ওলটপালট করে দিয়েছেন।
কেবল ব্যাটিংয়েই নয়, মাঠের আচরণেও বৈভব ফুটিয়ে তুলেছেন পরিণত মানসিকতার ছাপ। মাত্র ৩ রানের জন্য সেঞ্চুরি মিস করে যখন তিনি হতাশায় উইকেটে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন সতীর্থ যশস্বী জয়সওয়াল মাথায় হাত দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। তবে সাজঘরে ফেরার পর এই কিশোর কোনো নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি। বল হাতেও দলের কৌশলে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, সতীর্থ ব্রিজেশ শর্মার কাঁধে হাত দিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, রিয়ান পরাগের সঙ্গে ফিল্ডিং সাজানো নিয়ে কথা বলেছেন, এমনকি আম্পায়ার অ্যাড্রিয়ান হোল্ডস্টকের সঙ্গেও হাস্যরসে মেতে উঠেছেন।
বৈভবের এই সহজাত ও নির্ভীক ক্রিকেট খেলার প্রশংসা করতে গিয়ে ম্যাচ শেষে রিয়ান পরাগ জানান যে, তাঁরা বৈভবকে সম্পূর্ণ নিজের মতো করে খেলতে দেন, তাঁর খেলায় কোনো হস্তক্ষেপ করেন না। দলের অন্যতম কোচ বিক্রম রাঠোড়ও স্বীকার করেছেন যে, এই ছেলের মাথায় ঠিক কী চলে তা আগে থেকে বোঝা অসম্ভব। অন্যদিকে ধ্রুব জুরেলের মতে, বৈভবের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সে আগে থেকে কোনো গৎবাঁধা পরিকল্পনা করে মাঠে নামে না। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বৈভব সূর্যবংশী যেভাবে কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, তাতে বলাই যায়—তাঁর এই গৌরবময় পথচলার তো কেবল শুরু।