ক্রিস গেইলকে টপকে আইপিএলের নতুন ছক্কা সম্রাট বৈভব সূর্যবংশী

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) এলিমিনেটর ম্যাচে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিপক্ষে রাজস্থান রয়্যালসের তরুণ তুর্কি বৈভব সূর্যবংশী যে তাণ্ডব চালালেন, তা ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মাত্র ২৯ বলে ৯৭ রানের এক অতিমানবীয় ইনিংস খেলে তিনি শুধু প্রতিপক্ষের বোলিং লাইনআপকেই গুঁড়িয়ে দেননি, বরং একের পর এক বিশ্বরেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়েছেন। তার এই বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করে রাজস্থান রয়্যালস নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৪৩ রানের পাহাড়সম পুঁজি সংগ্রহ করেছে, যা আইপিএলের প্লে-অফ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ।
এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের সুবাদে ২০২৬ সালের আইপিএল আসরে মোট ৬৫টি ছক্কা হাঁকানোর নতুন রেকর্ড গড়লেন সূর্যবংশী। এর মাধ্যমে তিনি ২০১২ সালে ক্রিস গেইলের গড়া ৫৯টি ছক্কার ঐতিহাসিক কীর্তিকে ছাড়িয়ে যান। ম্যাচটিতে মাত্র ১৬ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করে আইপিএল প্লে-অফের ইতিহাসে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ডে সুরেশ রায়নার পাশে নাম লিখিয়েছেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। এটি চলতি আসরে তার চতুর্থবারের মতো এক ইনিংসে ১০ বা তার বেশি ছক্কা মারার নজির, যা গেইলের সাথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ এবং এক একক আসরে তিনবার এই কীর্তি গড়া প্রথম ব্যাটার তিনি।
পাওয়ারপ্লেতে তার চড়াও হওয়া ছিল দেখার মতো। এবারের আসরে পাওয়ারপ্লেতেই তিনি তুলে নিয়েছেন রেকর্ড ৪৯০ রান, যা ২০১৬ সালে ডেভিড ওয়ার্নারের করা ৪৬৭ রানকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। পাওয়ারপ্লেতে এবার নিয়ে মোট ৫ বার পঞ্চাশোর্ধ্ব রান করলেন এই উদীয়মান তারকা, যেখানে এক আসরে সর্বোচ্চ ৬ বার এমন কীর্তি গড়ে সবার ওপরে আছেন কেবল ডেভিড ওয়ার্নার। এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক না হওয়া এই ‘আনক্যাপড’ ব্যাটার আসরে ১৫ ইনিংসে সর্বমোট ৬৮০ রান সংগ্রহ করে ভেঙে দিয়েছেন ২০২৩ সালে যশস্বী জয়সওয়ালের করা ৬২৫ রানের রেকর্ড। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ২৪২.৮৫ স্ট্রাইক রেটে এই রান করেছেন তিনি, যা বিশ্বের যেকোনো পুরুষ টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে ২০০-এর বেশি স্ট্রাইক রেটে ৬০০-এর বেশি রান করার প্রথম নজির।
সানরাইজার্সের বিপক্ষে এই ম্যাচে সূর্যবংশী একাই হাঁকান ১২টি ছক্কা, যা আইপিএলের প্লে-অফ ইতিহাসে যেকোনো ব্যাটারের জন্য সর্বোচ্চ এবং আইপিএলে একজন ভারতীয় ব্যাটার হিসেবে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার যৌথ রেকর্ড। এর আগে জয়পুরেও এই সানরাইজার্সের বিপক্ষেই ১২টি ছক্কা মেরেছিলেন তিনি। পাওয়ারপ্লেতে ৮টি ছক্কা মেরে এক ইনিংসে পাওয়ারপ্লেতে সর্বোচ্চ ছক্কার বিশ্বরেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন। ৩৩৪.৪৮ স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করা সূর্যবংশী আইপিএল প্লে-অফে পাওয়ারপ্লেতে একাই করেন ৬০ রান। ২৫ বা তার বেশি বল খেলা ইনিংসে এটি আইপিএল ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্ট্রাইক রেটের কীর্তি।
সূর্যবংশীর তাণ্ডবের দিনে রাজস্থান রয়্যালসের উদ্বোধনী জুটিতে আসে ১২৫ রান, যা আইপিএল প্লে-অফের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ওপেনিং জুটি। রাজস্থানের ইনিংসের প্রথম ১০ ওভারেই আসে ১৩৬ রান, যা প্লে-অফের ইতিহাসে যেকোনো দলের জন্য প্রথম ১০ ওভারের সর্বোচ্চ সংগ্রহ। পুরো ইনিংসে রয়্যালস ব্যাটাররা মোট ৩৭টি বাউন্ডারি হাঁকান, যার মধ্যে ছিল ১৭টি ছক্কা। দুই দলের এই ম্যাচে মোট ছক্কা হয়েছে ২৬টি, যা প্লে-অফের যেকোনো ম্যাচে একটি রেকর্ড। ম্যাচে দুই দলের সম্মিলিত পাওয়ারপ্লে স্কোর ছিল ১৫১ রান, যেখানে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ মাত্র ২.৪ ওভারে দলীয় ৫০ রান স্পর্শ করে প্লে-অফের দ্রুততম দলীয় অর্ধশতকের রেকর্ড গড়ে।
রাজস্থানের ব্যাটারদের এমন রুদ্ররূপের সামনে সানরাইজার্সের বিশ্বজয়ী অধিনায়ক প্যাট কামিন্স তার টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে খরুচে বোলিংয়ের তিক্ত স্বাদ পেয়েছেন। চার ওভারের কোটায় তিনি হজম করেছেন রেকর্ড ৬৪ রান। এছাড়া সানরাইজার্সের ইতিহাসে এই প্রথম প্লে-অফের এক ম্যাচে তাদের তিনজন বোলার ৫০-এর বেশি রান দেওয়ার লজ্জাজনক রেকর্ডের মুখোমুখি হলেন। সব মিলিয়ে বৈভব সূর্যবংশীর রেকর্ডের মহোৎসবে এই এলিমিনেটর ম্যাচটি আইপিএলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা রোমাঞ্চকর এক লড়াই হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।