অভিশাপ জয় করে ইতিহাসের পাতায় উইসা, পর্তুগালের সঙ্গে ড্রয়ে বিশ্বকাপে ফিরল ডিআর কঙ্গো

টেক্সাসের হিউস্টন স্টেডিয়ামে এক অবিশ্বাস্য এবং আবেগঘন ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) বিশ্বমঞ্চে তাদের প্রত্যাবর্তনের গল্পটি লিখেছে রূপকথার মতো। এই ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর হয়ে ইতিহাস গড়েছেন ইয়োয়ান উইসা। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের পঞ্চম মিনিটে কর্নার কিক থেকে আসা বলে দুর্দান্ত এক হেডে গোল করে তিনি কেবল দলকে সমতায়ই ফেরাননি, বরং বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের দেশের হয়ে প্রথম গোলের গৌরবও অর্জন করেছেন। বায়ান্ন বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা কঙ্গোর জন্য এই পয়েন্ট এক স্মরণীয় মাইলফলক হয়ে রইল।
ম্যাচের শুরুটা ছিল পর্তুগালের জন্য স্বপ্নের মতো। মাত্র ৬ মিনিটের মাথায় জোয়াও নেভেসের গোলে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো সমর্থক লাল রঙে রাঙিয়ে তুলেছিলেন পুরো স্টেডিয়াম। পর্তুগিজরা এই ম্যাচটি উৎসর্গ করেছিল তাদের প্রয়াত সতীর্থ দিয়োগো জোটার স্মরণে। গত গ্রীষ্মে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ভাইসহ প্রাণ হারানো জোটার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ম্যাচের আগে জায়ান্ট স্ক্রিনে তার ভিডিও চিত্র দেখানো হয় এবং পর্তুগিজ খেলোয়াড়েরা তার নাম লেখা রিস্টব্যান্ড পরে মাঠে নামেন।
উইসার এই গোলটি কেবল পরিসংখ্যানের খাতায় যোগ হওয়া কোনো সংখ্যা নয়, এটি এক অদম্য মানসিক শক্তির উপাখ্যান। মাত্র পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের জুলাই মাসে এক ভয়াবহ অ্যাসিড হামলার শিকার হয়েছিলেন এই ফরোয়ার্ড। নিজের বাসায় এক হামলাকারী নারীর ছোঁড়া অ্যাসিডে গুরুতর জখম হন তিনি। দীর্ঘ ছয় মাসের চিকিৎসা এবং উভয় চোখে অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে। সেই দুঃসময়ে চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, সারা জীবন তাকে চোখের ড্রপ ব্যবহার করতে হবে। হামলাকারীর ১৮ বছরের কারাদণ্ড হলেও উইসার মনে গেঁথে গেছে সারাজীবনের ক্ষত ও ট্রমা।
অতীতের সেই ভয়াল স্মৃতি রোমন্থন করে উইসা জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি মানসিকভাবে অনেক গুটিয়ে গিয়েছিলেন এবং একা ঘুমাতেও ভয় পেতেন। এমনকি তিনি নিজের শরীরের ক্ষতচিহ্নগুলোকে মুছে ফেলার জন্য অস্ত্রোপচারের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ এগুলোকে তিনি তার জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। লরিয়েন্টের সাবেক ম্যানেজার ক্রিস্টোফ পেলিসিয়ার এবং সতীর্থ পিয়েরে-ইভস হামেল বারবার তার অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রশংসা করেছেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা সেই মানুষটিই আজ বিশ্বমঞ্চে নিজের দেশের ত্রাণকর্তা।
ম্যাচ শেষে হিউস্টনের গ্যালারিতে কঙ্গো সমর্থকদের উল্লাস ছিল বাঁধভাঙা। বায়ান্ন বছর পর ফিরে এসেই টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট পর্তুগালকে রুখে দেওয়া তাদের জন্য এক বিশাল অর্জন। আর উইসার এই গোলটি প্রমাণ করে দিল, জীবনের চরমতম ট্র্যাজেডি জয় করেও কীভাবে মাথা উঁচু করে লড়তে হয়। মাঠের লড়াইয়ে ১-১ সমতা থাকলেও, মানবিক দৃঢ়তার লড়াইয়ে উইসা এদিন জয়ী হয়েছেন সর্বান্তকরণে।