ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার শান্তি পুরস্কার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রদান নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। আসন্ন বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এমন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে সংস্থাটি বিতর্কের মুখে পড়েছে এবং খেলাধুলার সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছেন ফুটবল কর্মকর্তারা।
নরওয়েজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এনএফএফ) সভাপতি লাইস ক্লাভনেস ফিফাকে এই শান্তি পুরস্কার বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এ ধরনের পুরস্কার প্রদান ফিফার এখতিয়ারভুক্ত নয় এবং এটি খেলার জগৎকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ফেলবে। তার মতে, শান্তি পুরস্কার প্রদানের মতো কাজ নোবেল কমিটির মতো স্বাধীন সংস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।
ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে বিশ্ব ফুটবলের এই সংস্থাটি গত ডিসেম্বরে বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে তাদের উদ্বোধনী শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়। অনেকেই এটিকে ট্রাম্পের জন্য এক প্রকার সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে দেখছেন, যিনি বহুবার বলেছেন যে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে এই বছরের বিশ্বকাপ আয়োজন করছে।
একটি অনলাইন ব্রিফিংয়ে ক্লাভনেস বলেন, “আমরা [এনএফএফ] চাই এই [ফিফার শান্তি পুরস্কার] বিলুপ্ত করা হোক। আমরা মনে করি না এমন একটি পুরস্কার প্রদান ফিফার কাজের আওতাভুক্ত। আমাদের দেশে নোবেল কমিটি এই কাজটি স্বাধীনভাবে করছে।” তিনি আরও বলেন, “এটা গুরুত্বপূর্ণ যে ফুটবল ফেডারেশন, কনফেডারেশন এবং ফিফা এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলুক যেখানে রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে দূরত্বের বিষয়টি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এ ধরনের পুরস্কার প্রায়শই অত্যন্ত রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, যদি না সেগুলোর জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী নীতি ও অভিজ্ঞতার অধিকারী কোনো স্বাধীন জুরি ও মানদণ্ড থাকে।”
ক্লাভনেস জোর দিয়ে বলেন, “এই কাজ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও সংবেদনশীল। আমি মনে করি, একটি সংস্থার সুযোগ-সুবিধা, দায়িত্ব এবং সর্বোপরি সুশাসনের দিক থেকে ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে চলা উচিত।”
৪২ বছর বয়সী এই আইনজীবী আরও জানান, এনএফএফ ট্রাম্পকে পুরস্কার প্রদানের বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের জন্য ‘ফেয়ারস্কোয়ার’ নামক একটি অলাভজনক সংস্থার করা অভিযোগকে সমর্থন করবে। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে যে ইনফান্তিনো এবং ফিফা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়ে তাদের নিজস্ব নৈতিক নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে।
তিনি বলেন, “এসব বিষয়ে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা উচিত। ‘ফেয়ারস্কোয়ার’-এর অভিযোগের বিষয়ে একটি স্বচ্ছ সময়সীমার মধ্যে তদন্ত হওয়া উচিত এবং এর কারণ ও ফলাফল স্পষ্টভাবে জানানো উচিত।” ফিফা এ বিষয়ে আল জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলার জ্যাকসন আরভিন বলেছেন, ফিফা তার মানবধিকার নীতিকে উপহাস করেছে এবং খেলাধুলার ইতিবাচক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
উল্লেখযোগ্য যে, এই পুরস্কার ঘোষণার এক মাস পর যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় সামরিক হামলা চালায় এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান সীমান্তে যৌথ বিমান হামলা শুরু করে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরভিন বলেন, “এমন সিদ্ধান্ত, যেমনটি আমরা এই শান্তি পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে দেখেছি, তা তাদের মানবধিকার সনদ এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য ফুটবলকে ব্যবহার করার চেষ্টাকে উপহাস করার সামিল।” তিনি আরও বলেন, “এই ধরনের সিদ্ধান্ত আমাদের খেলাধুলার যে ভাবমূর্তি রয়েছে, বিশেষ করে শীর্ষ পর্যায়ে, তা আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বর্তমানে তা সমাজ এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে, যা এই খেলার প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্যকে ম্লান করে দিচ্ছে।”
২০১৭ সালে ফিফা তাদের প্রথম মানবধিকার নীতি প্রকাশ করে। ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তাদের মানবধিকার কাঠামোতে আয়োজক শহরগুলোর অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং বৈষম্য নিষিদ্ধ করার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো মনে করে, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং নির্বাসন অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে খেলোয়াড়, ভক্ত ও কর্মীদের মানবাধিকার ঝুঁকির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেওয়ার জন্য ফিফার আরও অনেক কিছু করা উচিত।