ত্রুটিপূর্ণ দলগুলোর মধ্যে ভুল পদক্ষেপে ভরা এক খেলা

থ্রিলার ম্যাচে নাটকীয় জয় কলকাতা নাইট রাইডার্সের: শেষ বলে লখনউকে হারাল এক রানে
লখনউ, [তারিখ]: এক শ্বাসরুদ্ধকর সুপার ওভারের থ্রিলারে লখনউ সুপার জায়ান্টসকে মাত্র এক রানে হারিয়ে আইপিএল-এর চলতি আসরে আরও একটি অবিস্মরণীয় জয় ছিনিয়ে আনলো কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল এক দলের হাতে, পরক্ষণেই তা চলে গেছে অন্য দলের মুঠোয়, এমন টানটান উত্তেজনার মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে লখনউয়ের ক্রিকেটপ্রেমীরা। দুই দলেরই ভুলভ্রান্তির পসরা সাজানো এই ম্যাচটি যেন চলতি মরসুমের সবচেয়ে ‘মন্দ অথচ সেরা’ খেলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নির্ধারিত ২০ ওভারে ম্যাচ টাই হওয়ার পর সুপার ওভারে লখনউকে মাত্র এক রানের কঠিন লক্ষ্য রক্ষা করতে হলেও, কেকেআর বোলারদের দাপটে তা সম্ভব হয়নি। এর আগেই নিকোলাস পুরান সাজঘরে ফিরে গিয়েছিলেন, তার মুখে ছিল হতাশার ছাপ। বল হাতে লখনউয়ের হয়ে শেষ ওভারের বোলার কার্তিক ত্যাগী, যিনি ম্যাচের মূল পর্বে পরপর দুটি বীমার ছুঁড়ে এবং শেষ বলে ছক্কা হজম করেও দলকে জয়ের প্রান্তে এনেছিলেন, তার শারীরিক ভাষায়ও ছিল সীমাহীন ক্লান্তি ও হতাশা।
টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে কলকাতা নাইট রাইডার্সের শুরুটা ছিল অত্যন্ত মন্থর ও এলোমেলো। ৬ ওভারে মাত্র ৩১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে তারা চলতি মরসুমের পাওয়ার প্লেতে সর্বনিম্ন রান সংগ্রহের রেকর্ডগুলোর একটিতে নিজেদের নাম লেখায়। ওপেনিং জুটি থেকে তাদের গড় রান ১৮.৩৭, যা সব দলের মধ্যে সর্বনিম্ন। মহসিন খানের দুরন্ত বোলিংয়ে ১০ ওভার শেষে কেকেআর-এর স্কোর ছিল ৬৪/৪। এই পরিস্থিতিতে রিংকু সিং ও ক্যামেরন গ্রিন জুটি দলের হাল ধরেন। বিশেষ করে রিংকুর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং কেকেআরকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনে। লখনউয়ের স্পিনারদের দুর্বল ফিল্ডিং এবং দিগ্বেশ রাঠির নির্বোধ বোলিং রিংকু সিংকে রানের লাগাম খুলে দেয়, যার ফলস্বরূপ রিংকু একাই দলের রানের চাকা ঘোরাতে থাকেন। ১৪তম ওভারে দিগ্বেশ রাঠি দুবার শর্ট ও ওয়াইড বল করে রিংকুকে সুযোগ দেন, এবং রিংকু তার সদ্ব্যবহার করেন। অধিনায়ক ঋষভ পন্ত রাঠিকে শেষ ওভারের জন্য রেখেছিলেন, যা অত্যন্ত খারাপভাবে বুমেরাং হয়ে ২৬ রান দিয়ে বসে।
লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে লখনউ সুপার জায়ান্টসের টপ অর্ডারেও পরিবর্তন দেখা যায়, যা এই মরসুমে তাদের নিয়মিত বৈশিষ্ট্য। মার্করাম ও মিচেল মার্শকে ওপেনিংয়ে পাঠানো হয়, যদিও তারা আগের ম্যাচে বদোনিকে ওপেনার হিসেবে চেষ্টা করেছিল। কেকেআর-এর মতো লখনউ একসাথে উইকেট না হারালেও, নবম ওভারের মধ্যে তাদের প্রয়োজনীয় রান রেট বেড়ে দাঁড়ায় ৯-এ। পন্ত এবং মার্করাম জুটি ধীরে ধীরে স্কোরবোর্ড সচল রাখলেও, লখনউয়ের ফিল্ডিংয়ের ভুলে তাদের উপর চাপ কমে যায়। সুনীল নারিন ও বরুণ চক্রবর্তী তাদের প্রথম দুই ওভারে উইকেট নিতে পারেননি, যা লখনউকে বাড়তি সুবিধা দেয়।
ধীরগতির পিচে পন্ত দ্রুতই বুঝে যান যে, স্কয়ারের পেছনের দিকে শট খেলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তিনি কার্তিক ত্যাগী এবং সুনীল নারিনকে লক্ষ্য করে একই ধরনের শট খেলে তিন-তিনটি বাউন্ডারি হাঁকান। তবে ম্যাচের মোড় আবারও ঘুরে যায় যখন কেকেআর কৌশলগত পরিবর্তন আনে। নিকোলাস পুরানকে আটকে রাখার জন্য বরুণ চক্রবর্তী ক্রমাগত অফ স্টাম্পের বাইরে দ্রুত ও ওয়াইড বল করতে থাকেন। প্রথম বলে পুরান চমৎকার কভার ড্রাইভ খেললেও, চক্রবর্তী তার কৌশল থেকে সরেননি। ফলস্বরূপ, পুরান দুবার বল মিস করেন এবং তৃতীয় প্রচেষ্টায় শর্ট থার্ড-ম্যানে ক্যাচ তুলে দিয়ে ফিরে যান।
শেষদিকে, কার্তিক ত্যাগীর ভয়ংকর বোলিংয়ের কারণে লখনউ শেষ ১০ বলে ২৭ রান তুলে স্কোর সমান করে ফেলে। এরপর সুপার ওভারেও লখনউ আশ্চর্যজনকভাবে নিকোলাস পুরানকে নারিনের মুখোমুখি করে, যে কিনা মূল ম্যাচে ব্যাট-বলে সংযোগ ঘটাতে সংগ্রাম করছিল। পুরো ম্যাচে দুই দলেরই কৌশলগত ত্রুটি, ফিল্ডিংয়ের দুর্বলতা, এবং অদ্ভুত কিছু সিদ্ধান্তের ছড়াছড়ি ছিল। তবে শেষ হাসি হাসল কলকাতা নাইট রাইডার্স, যারা এই “সবচেয়ে বাজে এবং সেরা” ম্যাচে শেষ পর্যন্ত “একটু কম খারাপ” প্রমাণিত হলো।
তথ্যসূত্র: ক্রিক বাজ