রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় গত পাঁচ বছরে বন্য হাতির আক্রমণে ১৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে মানুষের হাতে শিকার, বিদ্যুতায়িত ফাঁদ এবং আবাসস্থল সংকটের মতো নানা কারণে মারা গেছে ৭টি বন্য হাতি। বন বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল এই পাঁচ বছরেই মানুষ ও হাতির মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৩০৪টি পরিবার।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত দেড় দশকে রাঙামাটিতে হাতির আক্রমণে অন্তত ৩৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন unnatural কারণে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৩টি বন্য হাতি। মূলত হাতির প্রথাগত আবাসস্থল মারাত্মকভাবে সংকুচিত হওয়া এবং বন্য প্রাণীর চলাচলের ঐতিহ্যবাহী করিডোরগুলো জবরদখল করে মানুষের বসতি ও নানা স্থাপনা গড়ে তোলার কারণেই এই সংঘাত আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জেলার কাপ্তাই, লংগদু ও বরকল উপজেলায় মানুষ ও হাতির এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে কাপ্তাইয়ে হাতির চলাচলের করিডোর হিসেবে পরিচিত বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায়শই বন্য হাতির পাল মূল সড়ক ও লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। এতে গ্রামীণ জনপদের জুমক্ষেত, কৃষিপণ্য ও বসতঘর ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম প্রাণহানির ঝুঁকি বিরাজ করছে।
মানুষ ও হাতির সংঘাতের মাত্রা কমাতে প্রায় চার বছর আগে কাপ্তাই উপজেলায় ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সোলার ফেন্সিং নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাত্র এক বছরের মধ্যেই তা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে হাতির লোকালয়ে অবাধ প্রবেশ এবং এর ফলে সৃষ্ট সংঘাত রোধে কোটি টাকার এই সরকারি উদ্যোগ কার্যত কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেনি।
পরিসংখ্যানে আরও প্রকাশ পায়, গত পাঁচ বছরে হাতির আক্রমণে ১৩ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ১৩ জন। এই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মোট ৩০৪টি পরিবারকে বন বিভাগের পক্ষ থেকে সরকারি ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন রাঙামাটি অঞ্চলে অর্ধশতাধিক বন্য হাতি বিচরণ করছে বলে ধারণা করছে বন বিভাগ। তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করতে বর্তমানে একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। রাঙামাটি বন সার্কেলের প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল সরকার জানান, এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে পার্বত্য অঞ্চলে বন্য হাতির প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে।
পরিবেশ ও প্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বিচারে বন উজাড়, হাতির চলাচলের করিডোর দখল এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে এই বিশালকায় প্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। খাদ্যের তীব্র সংকটে পড়ে হাতি যখন লোকালয়ে চলে আসে, তখনই সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এই সংকট নিরসনে দ্রুত বনাঞ্চল রক্ষা, হাতির করিডোর পুনরুদ্ধার, দেশীয় প্রজাতির গাছ দিয়ে বন সমৃদ্ধকরণ এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি।