রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের ডেবাছড়া এলাকায় একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পাঁচ গ্রামের প্রায় আট হাজার মানুষ। প্রতিবছর পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় কাঠের তৈরি নড়বড়ে সেতুটি ভেঙে পড়ায় যাতায়াতের বিকল্প পথ বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম বিপাকে পড়তে হয়েছে। কৃষিপণ্য পরিবহন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত থেকে শুরু করে জরুরি মুহূর্তে অসুস্থ রোগী ও প্রসূতি মায়েদের হাসপাতালমুখী হওয়া এখন এক প্রকার জীবনপণ লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ তক্তানালা থেকে রোয়াপাড়া ছড়ায় যাওয়ার পথে ডেবাছড়া খালের ওপর এলাকাবাসীর উদ্যোগে নির্মিত কাঠের সেতুটি সম্পূর্ণ ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। সেতুর বিভিন্ন অংশের তক্তা পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় কৃষক ভুবনজয় তঞ্চঙ্গ্যা জানান, এই পথেই এলাকার মানুষের ধানখেত ও বাগান অবস্থিত। সেতুটি সংস্কার না হওয়ায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য মূল সড়কে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিকল্প কোনো পথ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ভাঙা সেতুটি পারাপার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয় বাসিন্দা ভারতচন্দ্র কার্বারী বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় পূর্বে কাঠের সেতু নির্মিত হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রতিবছর এলাকার প্রতিটি পরিবার থেকে চাঁদা তুলে কাঠ ও তক্তা কিনে সেতুটি মেরামত করতে হয়, যাতে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু এ বছর পাহাড়ি ঢলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় দরিদ্র পরিবারগুলো মেরামতের খরচ জোগাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই পথ দিয়েই কলা, ফরাস শিম, বাদাম, আদা, হলুদ ও ঝাড়ু ফুলসহ বিভিন্ন মূল্যবান কৃষিপণ্য রাজস্থলী হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।
ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য মনিলতা তঞ্চঙ্গ্যা জানান, তক্তানালা ও রোয়াপাড়ার পাশাপাশি ফুঁছড়া, উলুছড়ি, মাইত কুমা পাড়া, উত্তর পাড়া, ওরাছড়ি ও ফারুয়া এলাকার মানুষও এই সেতু ব্যবহার করেন। এলাকার দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ পথেই যাতায়াত করে। সংযোগ সড়কের একটি অংশ ইতিমধ্যে পাকা হলেও কালভার্ট বা সেতুর অভাবে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাই এখানে একটি স্থায়ী স্টিল বা বেইলি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বিদ্যালাল চাকমা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত বরাদ্দ থেকে অতীতে সেতুটি একাধিকবার মেরামত করা হয়েছে। তবে ডেবাছড়া খালের ওপর প্রায় ২৫০ ফুট দীর্ঘ সেতু প্রয়োজন হওয়ায় কেবল কাঠের সেতু দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মিত হলে সীমান্ত সড়কের সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজও বেগবান হবে এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত কষ্ট লাঘব হবে।
বিলাইছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফরহাদ হোসেন জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সাধারণত সর্বোচ্চ ৫০ ফুট পর্যন্ত সেতু নির্মাণ করা হয়ে থাকে। ডেবাছড়া এলাকায় দীর্ঘ সেতু প্রয়োজন হওয়ায় অন্য কোনো বড় কোনো মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করা যেতে পারে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অভি দাশ বলেন, এত দীর্ঘ সেতু নির্মাণের জন্য বড় অংকের বরাদ্দের প্রয়োজন এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, তবে স্থানীয়ভাবে কাঠের সেতুটি সাময়িকভাবে মেরামতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম ফকির বলেন, বিলাইছড়ির যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ছোট কাঠের সেতুর পরিবর্তে স্থায়ী অবকাঠামো অত্যন্ত জরুরি। বারবার কাঠের সেতু মেরামত করে সরকারি ও ব্যক্তিগত অর্থের অপচয় রোধ করতে ডেবাছড়া এলাকায় দ্রুত একটি বেইলি সেতু নির্মাণে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। অবিলম্বে এই জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট মহールের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।