কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলো আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। অধিক বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাঠানোর কথা বলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসহায় যুবক এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের এসব পাহাড়ি আস্তানায় আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। ৫ নভেম্বর হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী ও লেদা নুরালীপাড়া সংলগ্ন গহিন পাহাড়ে সশস্ত্র পাচারকারীদের আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে এই ভয়াবহ চিত্র আবারও প্রকাশ্যে আসে। পাচারকারীদের প্রতিরোধের মুখে পরিচালিত ওই অভিযানে দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তরুণ সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখ (২৭)।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৫ নভেম্বর বিকেল ৫টার দিকে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ আভিযানিক দল রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালায়। ওই সময় একটি সশস্ত্র মানবপাচারকারী দল প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিককে জিম্মি করে রেখেছিল। যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করে পাচারকারীরা। যৌথ বাহিনীর পাল্টা জবাবে উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল গোলাগুলি হয়। একপর্যায়ে বাঁ কাঁধে ও বুকের পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের সন্তান সেনাসদস্য তিতাস শেখ। পরে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তিতাসের এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে ওই আস্তানা থেকে ৫৭ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার এবং চক্রের ৫ সদস্যকে অস্ত্রসহ আটক করতে সক্ষম হয় যৌথ বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র ও স্থানীয়দের অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফের এই মানবপাচার সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ে গঠিত কয়েকটি দুর্ধর্ষ সিন্ডিকেট। যার মধ্যে কুখ্যাত ‘লেংগা ছৈয়দুল’ চক্র এবং রঙ্গীখালী ও লেদাকেন্দ্রিক আবদুল করিম ও পাহাড়ি ডাকাত সিন্ডিকেট অন্যতম। দালালের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসহায় যুবকদের বিনা খরচে বা স্বল্প খরচে মালয়েশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টেকনাফে আনা হয়। এরপর তাদের অপহরণ করে গহিন পাহাড়ের গোপন আস্তানায় নিয়ে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালানো হয় এবং ভিডিও কল দেখিয়ে পরিবারের কাছে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। পাহাড়ের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভারী অস্ত্রের ব্যবহারের কারণে স্থানীয় সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
পাহাড়কেন্দ্রিক এই সশস্ত্র চক্রগুলোর দৌরাত্ম্য নিয়ে স্থানীয়রা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রঙ্গীখালী এলাকার বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ের দিক থেকে গুলির শব্দ ও জিম্মিদের আর্তনাদ শোনা যায়। ভারী অস্ত্রধারী পাচারকারীদের ভয়ে সাধারণ মানুষ জুম চাষ বা কাঠ সংগ্রহের জন্যও পাহাড়ে যেতে সাহস পান না। লেদা এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রশিদ আহমেদ বলেন, অপরিচিত লোকজনকে প্রতিদিন ইজিবাইক বা সিএনজিতে করে পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে যাওয়া হয় এবং স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় পাহাড়ে তুলে দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। হ্নীলা ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা মাস্টার নুরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পাহাড়কে টর্চার সেল বানানো হয়েছে। একজন সেনা সদস্যকে তারা গুলি করে হত্যা করেছে, যা সিন্ডিকেটের বেপরোয়া হয়ে ওঠার প্রমাণ। সেখানে স্থায়ী ক্যাম্প না বসালে এদের থামানো অসম্ভব।
এই সিন্ডিকেট নির্মূলে যৌথ বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, রঙ্গীখালী ও লেদা পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা জিম্মি ও মানবপাচারের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ৫৭ জনকে উদ্ধার এবং ৫ জনকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে মূল হোতাদের নাম পাওয়া গেছে এবং তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান রয়েছে। ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক কাউছার সিকদার জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর থেকে যেসব দালাল সাধারণ রোহিঙ্গাদের প্রলোভন দেখিয়ে পাহাড়ের পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে ক্যাম্পগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও ব্লক রেইড বাড়ানো হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে সেনাসদস্য তিতাস শেখ যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। পাহাড়ে কোনো সন্ত্রাসী বা মানবপাচারকারী চক্রের অস্তিত্ব রাখা হবে না এবং গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
বাংলাদেশে মানবপাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং ২০২৬ সালে সরকার ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হলেও পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য থামছে না। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের ‘ট্র্যাফিকিং ইন পারসন্স’ প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে গত দুই বছরের একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়ের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রকাশিত ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে মানবপাচার সংক্রান্ত মামলা ও তদন্তের সংখ্যা বাড়লেও অপরাধীদের সাজার হার এবং ভুক্তভোগী শনাক্তের সংখ্যা কমেছে। দ্রুত এই মানবপাচারকারী ও অপরাধী চক্রের হোতাদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।