ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি নির্মাতা ও অভিনেতা রাজ কাপুর, যিনি একদা 'দ্য গ্রেট শোম্যান' হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ছিলেন, তাঁর বর্ণিল কর্মজীবনের শেষ পর্যায় আজও এক জ্বলন্ত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। নবীন প্রজন্মের দর্শক যখন নতুন করে তাঁর সৃষ্টিগুলো আবিষ্কার করছেন, তখন বিশেষ করে ১৯৮৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রাম তেরি গঙ্গা মৈলি’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে নতুন করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এই ছবিতে নবাগত অভিনেত্রী মন্দাকিনীকে যেভাবে পর্দায় উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা আজও সিনেমা প্রেমীদের মাঝে এক ভিন্নধর্মী আলোচনার জন্ম দেয়।
রাজ কাপুর নিজেই একবার অকপটে স্বীকার করেছিলেন, ‘আমি নগ্নতার উপাসক।’ তাঁর কন্যা ঋতু নন্দার লেখা ‘রাজ কাপুর: দ্য ওয়ান অ্যান্ড অনলি শোম্যান’ বইটিতেই পাওয়া যায় সেই দর্শনের প্রতিফলন। ছবিটিতে রাজ কাপুরের ছোট ছেলে রাজীব কাপুরের বিপরীতে পাহাড়ি তরুণী গঙ্গার চরিত্রে অভিনয় করেন মন্দাকিনী। ছবির গল্পে গঙ্গা এক সরলমনা নারী, যে শহরের প্রেমিকের মায়ায় পড়ে শোষণ, প্রতারণা ও বঞ্চনার শিকার হয়। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে গঙ্গাকে এমন এক অসহায় নারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যার নিজের ভাগ্যের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
ছবিটি বক্স অফিসে অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক সাফল্য পেলেও নারী চরিত্রের উপস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চলচ্চিত্র সমালোচকদের বড় একটি অংশ। তাঁদের মতে, রাজ কাপুর একদিকে গঙ্গাকে ‘পবিত্রতা’র প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, অন্যদিকে ক্যামেরার কারসাজিতে বারবার তাঁকে যৌন আবেদনময়ী করে উপস্থাপন করেছেন। এমনকি মাতৃত্বের মতো পবিত্র মুহূর্তকেও ক্যামেরার লেন্স যেভাবে বন্দী করেছে, তা কেবল শৈল্পিক নয়, বরং দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তৈরি উপাদান বলেও অনেকে মনে করেন। তবে পরবর্তীতে মন্দাকিনী এক সাক্ষাৎকারে জানান, এসব বিতর্কিত দৃশ্য নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই।
সমালোচনার মুখে রাজ কাপুর বরাবরই তাঁর সৃজনশীল অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, গঙ্গার স্বল্পবসনা উপস্থিতি নিয়ে যতই গুঞ্জন থাকুক না কেন, গঙ্গা নদীর পবিত্রতায় মানুষের যে বিশ্বাস, তা-ই চরিত্রটির নিষ্কলুষতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাঁর ভাষায়, সব সমালোচনার পরেও গঙ্গা প্রবাহিত হয়, ঠিক যেমন সমাজের শত নির্যাতনের পরেও গঙ্গা চরিত্রটি অন্তরে নির্মল থাকে। তবে এই প্রতীকী ব্যাখ্যা সমসাময়িক অনেক আধুনিক সমালোচকের মন গলাতে পারেনি।
‘সত্যম শিবম সুন্দরম’, ‘প্রেম রোগ’ এবং ‘রাম তেরি গঙ্গা মৈলি’—রাজ কাপুরের জীবনের শেষ দিকের এই তিনটি কালজয়ী কাজ আজ আধুনিক চলচ্চিত্রের নতুন মূল্যায়নের মুখোমুখি। একদিকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই ছবিগুলো গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত, অন্যদিকে নারীদেহের উপস্থাপন এবং পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীকে দেখার বিষয়টি নিয়ে আধুনিক দর্শকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষও দৃশ্যমান।
আজ রাজ কাপুরকে ঘিরে দুটি বিপরীতমুখী মূল্যায়ন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তিনি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী নির্মাতা, অন্যদিকে তাঁর শেষের কাজগুলো আধুনিক যুগে নারী চরিত্রের উপস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। রাজ কাপুরের কাছে যা ছিল ‘পবিত্র নগ্নতা’, ভক্তদের কাছে তা শিল্পদর্শন হিসেবে সমাদৃত হলেও, আধুনিক সমালোচকদের চোখে তা আজও যৌনায়নের বিতর্কে আচ্ছন্ন হয়ে আছে।