বিবাহবিচ্ছেদের পর ২৬ দিনের রিহ্যাব ও প্যানিক অ্যাটাকের অন্ধকার দিনগুলো নিয়ে মুখ খুললেন চাহাল

বলিউড ও ক্রিকেটের রঙিন দুনিয়ার অন্দরে অনেক সময়ই লুকিয়ে থাকে একাকিত্বের গভীর অন্ধকার, যার সাম্প্রতিকতম ও মর্মান্তিক সাক্ষী হয়ে রইলেন ভারতের তারকা লেগ-স্পিনার যুজবেন্দ্র চাহাল। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে স্ত্রী ধনশ্রী বর্মার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁর জীবনে যে ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল, তা নিয়ে মুখ খুলেছেন এই প্রতিভাবান ক্রিকেটার। প্রাক্তন ভারতীয় ওপেনার আকাশ চোপড়ার সঞ্চালনায় জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘বৈঠ অ্যান্ড বল’-এ হাজির হয়ে রবিবার নিজের জীবনের সেই কঠিন অধ্যায়ের রোমহর্ষক ও আবেগঘন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন তিনি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কোরিওগ্রাফার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ধনশ্রীর সঙ্গে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে সাতপাকে বাঁধা পড়া চাহালের সেই সুখের সংসারে ভাঙন ধরার পর থেকেই শুরু হয় অফুরান মানসিক টানাপোড়েন, যা একসময় তাঁর পেশাদার ও ব্যক্তিগত জীবনকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছিল।

জনসমক্ষে পরিচিত মুখ হওয়ার সুবাদে ব্যক্তিগত জীবনের এই করুণ পরিণতি নিয়ে নেটদুনিয়ায় চলা লাগাতার ট্রোলিং ও কটাক্ষ চাহালকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছিল। পডকাস্টে চাহাল অকপটে স্বীকার করেছেন যে, উদ্বেগের মাত্রা এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যা তাঁর শারীরিক সুস্থতাকেও গ্রাস করতে শুরু করেছিল। প্যানিক অ্যাটাকের তীব্র জাঁতাকলে পড়ে মাঝেমধ্যেই তাঁর হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত হয়ে যেত এবং মুখের পেশিতে প্রচণ্ড টান ধরত। সেই ভয়ার্ত মুহূর্তগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, আতঙ্কে তাঁর মুখ সংকুচিত হয়ে আসত, কথা আটকে যেত এবং ঠোঁট শক্ত হয়ে একপাশে বেঁকে যাওয়ার মতো শারীরিক উপসর্গ দেখা দিত, যা দেখে আশেপাশের মানুষেরা সহজেই অনুমান করতে পারতেন যে তিনি কোনো গভীর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। জীবন কখনও এমন রূপ ধারণ করতে পারে, তা তাঁর কল্পনাতীত ছিল।

পরিস্থিতি এতটাই নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল যে, বিবাহবিচ্ছেদের সেই শোকের সময়ে তাঁর অতিরিক্ত মদ্যপানের অভ্যাস তৈরি হয়, যা আইপিএলের শুরুর দিনগুলোর সাধারণ সামাজিক আড্ডার গণ্ডি পেরিয়ে একসময় নেশায় পরিণত হয়েছিল। প্রিয় ক্রিকেট খেলাটিকেই হারিয়ে ফেলার তীব্র আশঙ্কা যখন তাঁকে গ্রাস করে, তখনই তিনি চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হন এবং পেশাদার সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২৬ দিন একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে কাটিয়ে নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান এই স্পিনার। একইসঙ্গে, নিজের পারফরম্যান্সের নেতিবাচক প্রভাব যাতে জাতীয় দলের ওপর না পড়ে, সেজন্য প্রাক্তন বিসিসিআই কোষাধ্যক্ষ অনিরুদ্ধ চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ারও সাহসী সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোলিংকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব জেনেই অন্যের পরোয়া না করে জীবনকে নতুনভাবে সাজানোর পণ করেছেন যুজবেন্দ্র চাহাল। এই দুঃসময়ে পরিবারের সদস্য এবং তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা ছায়ার মতো পাশে ছিলেন বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। বর্তমানে অতীতের সমস্ত অন্ধকার কাটিয়ে মানসিকভাবে অনেকটাই সুস্থ ও চাঙ্গা রয়েছেন এই তারকা ক্রিকেটার। এখন তাঁর সমস্ত মনোযোগ কেবল কঠোর ফিটনেস এবং ব্যক্তিগত সুস্থতার দিকে। চাহালের এই কামব্যাক কেবল ২২ গজে প্রতিপক্ষকে বোল্ড করার লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি জীবনের চরম বিপর্যয় কাটিয়ে নিজের অস্তিত্বকে নতুন আলোয় ফিরিয়ে আনার এক অবিশ্বাস্য ও অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প।

০%
০%
০%
০%