Advertisement

খুনের রহস্য ছাড়িয়ে আত্মপরিচয়ের সন্ধানে নিমিশা সাজয়নের ববিতা সিং রিপোর্টিং

একজন পুলিশ কর্মকর্তা হয়েও ছুটির আবেদন মঞ্জুর না হওয়ায় অদ্ভুত এক ফন্দি আঁটেন তিনি। শ্বশুরবাড়ির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নিজের গায়েই চাপিয়ে নেন বরখাস্ত হওয়ার তকমা। পেশাগত জীবনে তিনি একজন দায়িত্বশীল পুলিশ সদস্য হলেও পারিবারিক পরিমণ্ডলে যেন কেবলই এক ‘বেবি’। অম্বিকা পান্ডিত পরিচালিত ‘ববিতা সিং রিপোর্টিং’ সিনেমাটি ঠিক এভাবেই নারীর দ্বৈত সত্তা এবং অস্তিত্বের সংকটের এক চমৎকার আখ্যান তুলে ধরেছে।

সিনেমার মূল চরিত্র ববিতা সিং—অভিনয়ে নিমিশা সাজয়ন। পর্দার চিরাচরিত সাহসী বা দাপুটে পুলিশের ইমেজ এখানে অনুপস্থিত। বরং ববিতা এখানে একজন বাস্তবধর্মী মানুষ, যিনি তদন্ত করতে গিয়ে দ্বিধায় ভোগেন, ভুল করেন এবং মাঝেমধ্যে হোঁচট খান। তার জীবনের বড় চ্যালেঞ্জটি অপরাধী ধরা নয়, বরং মানুষের আবদার ও প্রত্যাশার ভারে নিজেকে ‘না’ বলতে না পারা। অফিসের বসের সন্তুষ্টি থেকে শুরু করে শ্বশুরবাড়ির প্রতিটি মানুষের মন জোগাতে তিনি প্রতিনিয়ত নিজের ব্যক্তিত্বকে বিলিয়ে দেন।

বিজ্ঞাপন

গল্পের মোড় ঘুরে যায় ববিতার শৈশবের বন্ধু বানসির হত্যাকাণ্ডের পর। খুনের রহস্য উদ্ঘাটনের এই দীর্ঘ যাত্রায় ববিতা কেবল একজন পুলিশ হিসেবেই নন, বরং একজন নারী হিসেবে নিজের হারানো আত্মমর্যাদা আর অসম্পূর্ণ অস্তিত্বের মুখোমুখি হন। ছবির চিত্রনাট্যকার অমিতা ব্যাস অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার প্রকাশ্যে আঘাত না করেও প্রতিদিন একজন নারীর স্বপ্ন ও আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। শারীরিক গড়ন নিয়ে কটাক্ষ, সন্তানহীনতার চাপ আর ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে তুচ্ছজ্ঞান করা—এমন নির্মম বাস্তবতাকে পরিচালক অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

ছবির অন্যতম চমকপ্রদ চরিত্র ববিতার স্বামী শরদ, যার ভূমিকায় অংশুমান পুষ্কর এক দুর্দান্ত অভিনয় উপহার দিয়েছেন। শরদ কোনো প্রথাগত অত্যাচারী নন; তিনি নিজেকে একজন ‘ভালো স্বামী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ভালোবাসেন। অথচ তার ভালোমানুষির আড়ালে লুকিয়ে থাকা পিতৃতান্ত্রিক অধিকারবোধ ও নিজের আধিপত্য বজায় রাখার কৌশলগুলো সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণের একটি।

বিজ্ঞাপন

কারিগরি দিক থেকে ‘ববিতা সিং রিপোর্টিং’ যেন সুদীপ শর্মার ‘পাতাল লোক’ বা ‘কোহরা’র আবহ মনে করিয়ে দেয়। নিমিশা সাজয়ন আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বর্তমান সময়ের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী। সংলাপের চেয়েও তার চোখের ভাষা ও নীরবতা ববিতার ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভকে দর্শকদের হৃদয়ে পৌঁছে দেয়। যদিও খুনের রহস্যের সমাধান পর্বে কিছুটা তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট, তবুও ববিতার মানস ভ্রমণের চিত্রায়ন সেই ঘাটতিকে ম্লান করে দেয়।

‘বেবি’ থেকে ‘ববিতা’ হয়ে ওঠার এই নিরন্তর লড়াই কেবল একজন নারীর জয়গান নয়, বরং এটি সেই মানসিক শৃৃঙ্খলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যা সমাজ যুগ যুগ ধরে নারীর পায়ে পরিয়ে রেখেছে। শেষ পর্যন্ত এটি একটি ক্রাইম থ্রিলার ছাপিয়ে হয়ে ওঠে এক অসামান্য আত্মোপলব্ধির গল্প, যেখানে খুনি ধরার চেয়েও নিজের সত্তাকে খুঁজে পাওয়া অনেক বেশি জরুরি ও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সব মিলিয়ে, ‘ববিতা সিং রিপোর্টিং’ বর্তমান সময়ের এক উজ্জ্বল ও সাহসী চলচ্চিত্র।

0%
0%
0%
0%