Advertisement

উপমহাদেশের সুরের জাদুকর মোহাম্মদ রফির জীবন ও গানের অনন্য আখ্যান

শীতের এক ধূসর সকালে কলকাতার সদর স্ট্রিট থেকে নিউমার্কেটমুখী যাত্রাপথে হঠাতই বাতাসে ভেসে আসা একটি সুর থমকে দিয়েছিল পথচলা। ‘পাখিটার বুকে যেন তির মেরো না’—গানের সেই করুণ আর মায়াবী সুরটি একটি ছোট্ট পানের দোকান থেকে আসছিল। দোকানটির নাম ‘তাজমহল পান শপ’, যার প্রতিটি কোণে সারি সারি সাজানো কিংবদন্তি শিল্পী মোহাম্মদ রফির ছবি। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে কেবলই বেজে চলে রফির গান। নিছক একটি দোকান যেন হয়ে উঠেছে এই অমর শিল্পীর প্রতি এক নীরব শ্রদ্ধার্ঘ্য। রফির প্রয়াণের চার দশকেরও বেশি সময় পার হয়েছে, তবুও তাঁর কণ্ঠ যেন প্রতিটি দিন নতুন করে বেঁচে ওঠে মানুষের যাপিত জীবনে।

১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই, যে সকালে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই সুরের জাদুকরের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়, সেই শোক আজও সংগীতপ্রেমীদের মনে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। মাত্র ৫৫ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে যখন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, তখন মুম্বাই শহরের আকাশ ভেঙে পড়েছিল অঝোর ধারায়। দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর থেকে শুরু করে অমিতাভ বচ্চন, লতা মঙ্গেশকর—পুরো শিল্পী সমাজ সেদিন পথে নেমেছিল প্রিয় মানুষটিকে বিদায় জানাতে। শোকের সেই জনসমুদ্র ভারতীয় সংগীত ইতিহাসের এক অমোঘ অধ্যায় হয়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

পাঞ্জাবের কোটলা সুলতান সিং গ্রামের ‘ফিকু’ থেকে বিশ্ববন্দিত শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পটি এক অদম্য সাধনার। আট-নয় বছর বয়সে গ্রামের এক ভ্রাম্যমাণ ফকিরের কণ্ঠে সম্মোহিত হয়ে সংগীতের যে বীজ রফির মনে রোপিত হয়েছিল, তা মহীরুহ হয়ে উঠেছিল মাটির টানে আর সাধনায়। লাহোরে শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠিন ব্যাকরণ শেখার পাশাপাশি সেই শৈশবের আবেগই তাঁর গায়কিতে এনে দিয়েছিল এক অনন্য দরদ। কে এল সায়গলের এক অনুষ্ঠানে আকস্মিকভাবে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যে বিস্ময়কর প্রতিভা দেখিয়েছিলেন, তা সংগীত পরিচালক শ্যাম সুন্দরের নজর এড়ায়নি। সেই শুরু, এরপর নওশাদের হাত ধরে বোম্বের মায়ানগরীতে প্রবেশ এবং আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা।

মোহাম্মদ রফি মানেই বৈচিত্র্যের এক বিস্ময়কর আধার। তিনি কেবল একজন প্লেব্যাক গায়ক ছিলেন না, ছিলেন ‘কণ্ঠের অভিনেতা’। শাম্মি কাপুরের রোমান্টিক উচ্ছ্বাস, দিলীপ কুমারের গভীর বিষাদ কিংবা দেব আনন্দের অভিজাত গায়কী—সবই তাঁর কণ্ঠের জাদুতে রূপ পেত প্রাণ। প্রায় ২৬ হাজার গানের বিশাল ভাণ্ডারে তিনি গেয়েছেন ভজন, কাওয়ালি, গজল থেকে শুরু করে দেশাত্মবোধক গান। প্রতিটি গানে তিনি নিজেকে এমনভাবে বিলিয়ে দিতেন যে মনে হতো প্রতিটি গানই যেন ভিন্ন এক ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর। উচ্চারণের স্পষ্টতা আর আবেগের সূক্ষ্ম বুনন তাঁর গানকে করেছে পাঠশালাতুল্য।

বিজ্ঞাপন

বাংলা গানের ভাণ্ডারেও রফির অবদান অমলিন। কাজী নজরুল ইসলামের ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’ কিংবা ‘পাখিটার বুকে যেন তির মেরো না’র মতো গানে তিনি যে মমতা আর দরদ মিশিয়েছেন, তা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। বাংলা তাঁর মাতৃভাষা না হওয়া সত্ত্বেও উচ্চারণের এই শুদ্ধতা ও আন্তরিকতা আজও বিস্ময় জাগায়।

ব্যক্তিগত জীবনেও রফি ছিলেন এক মহানুভব মানুষ। প্রচারবিমুখ এই শিল্পী নীরবে কতজনের অন্ন সংস্থান করেছেন, তার হিসাব কেউ রাখেনি। সামর্থ্যহীন শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর নিত্য অভ্যাস। কিশোর কুমারের সাথে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প লোকমুখে ফিরলেও বাস্তবে তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা ছিল পারিবারিক। রফির মরদেহের পাশে কিশোর কুমারের সেই অশ্রুসজল চাহনি আজও ভারতীয় সংগীতের এক চরম আবেগঘন চিত্র।

ফিল্মফেয়ার পুরস্কার থেকে পদ্মশ্রী—সম্মাননার ঝুলি তাঁর পূর্ণ। তবে রফির প্রকৃত উত্তরাধিকার কোনো মেডেল কিংবা ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়। লন্ডন থেকে ঢাকা, লাহোর থেকে দিল্লি—প্রতিটি প্রান্তে নতুন প্রজন্মের সংগীত সাধকদের কাছে রফি আজও এক চিরন্তন প্রেরণা। অন্ধ কোনো শ্রোতা একবার বলেছিলেন, ‘যত দিন আমার কান শুনতে পাবে, তত দিন আমার চোখের প্রয়োজন হবে না।’ এই অমোঘ বাক্যটিই মোহাম্মদ রফির সংগীতজীবনের শ্রেষ্ঠ মূল্যায়ন। তিনি কোনো নস্টালজিয়া নন, তিনি প্রতিটি প্রজন্মের রক্তে মিশে থাকা এক অমর সুরের ধারা।

0%
0%
0%
0%