এফডিসিতে শুটিংয়ের ব্যস্ততায় প্রাণ ফিরে পেল সিনেমার রূপালী জগৎ

শনিবারের দুপুরে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা এফডিসি যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল এক অচেনা উন্মাদনায়। ঝকঝকে রোদেলা দুপুরে শুটিংয়ের তোড়জোড়, সেট তৈরির ব্যস্ততা আর রূপালি পর্দার পেছনের মানুষগুলোর কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছিল এফডিসির প্রতিটি অলিগলি। এই কর্মচঞ্চলতার মাঝে যেন এক টুকরো গ্ল্যামার নিয়ে হাজির হয়েছিলেন নুসরাত ফারিয়া ও আফরান নিশো। দীর্ঘদিনের ব্যস্ততার খোলস ছেড়ে শুটিংয়ের সুবাদে তাঁদের এই দেখা হওয়াটা ছিল যেন এক চমৎকার সংযোগ।
পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয়ের নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘লাপাত্তা’র শুটিংকে কেন্দ্র করে ঝরনা স্পটের পুকুর পাড়ে ছিল সাজ সাজ রব। গোলাপি শাড়িতে অনন্যা নুসরাত ফারিয়া যখন সেটে প্রবেশ করলেন, তখন যেন চারপাশের আবহে এক নতুন প্রাণ সঞ্চার হলো। বাহারি রঙের কাপড়ে মোড়ানো কৃত্রিম সেতু আর ফুলের সাজে তৈরি হয়েছিল এক মায়াবী পরিবেশ। জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নতুন এক অভিজ্ঞতার স্বাদ নিচ্ছেন। সহশিল্পী রুশো শেখের সঙ্গে নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় গান ‘এই বুকে বইছে যমুনা’র ছন্দে যখন তাঁরা দৃশ্য ধারণ করছিলেন, তখন যেন নস্টালজিয়া ভর করেছিল পুরো সেটে। এমনকি এই সিনেমায় বহুরূপী অভিনেতা নাসির উদ্দিন খানের বিশেষ উপস্থিতি নিয়েও রয়েছে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা।
একই সময়ে এফডিসির অন্য এক প্রান্তে বিজ্ঞাপনচিত্রের শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন ছোট পর্দার সুপারস্টার আফরান নিশো। রূপসজ্জা কক্ষে দুপুরের খাবারের বিরতিতে বসে নিশো শোনালেন তাঁর আগামীর পরিকল্পনার কথা। দর্শক মহলে ব্যাপক আলোচিত ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার সাফল্যের পর, এ বছর বড় পর্দায় আবারও তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে তৈরি হয়েছে তুমুল কৌতূহল। নিশো জানালেন, সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছর বড় পর্দায় একাধিক চমক নিয়ে হাজির হতে পারেন তিনি। এফডিসির রূপসজ্জা কক্ষে শঙ্খ দাশ গুপ্ত ও পার্থ শেখের সাথে আড্ডায় যখন নিশো মেতে উঠলেন, তখন সেখানে তৈরি হলো এক আড্ডামুখর পরিবেশ। কাজের ফাঁকে নিশো আর ফারিয়ার পারস্পরিক কুশল বিনিময় যেন প্রমাণ করল, তারকাদের জীবনের এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই এফডিসির দীর্ঘ ইতিহাসের অমূল্য অংশ।
এদিকে শুটিংয়ের ব্যস্ততার আড়ালে এফডিসির বারান্দায় আড্ডায় জমেছিলেন একসময়ের তুখোড় পরিচালক বাদল খন্দকার। ‘বিদ্রোহী পদ্মা’ কিংবা ‘সাগরিকা’র মতো কালজয়ী সিনেমা উপহার দেওয়া এই নির্মাতা যখন নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের সাথে এফডিসির সোনালী অতীত, কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার এহতেশাম থেকে শুরু করে রায়হান রাফীর সমসাময়িক নির্মাণশৈলী নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল যেন চলচ্চিত্রের এক মহাকাব্য জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সালমান শাহ থেকে শুরু করে শাকিব খানের সময়কাল—সিনেমার বিবর্তনের নানা গল্পে মুখর হয়ে উঠেছিল বিকেলটা।
কড়ইতলার আড্ডা, ক্যানটিনের ব্যস্ততা কিংবা রূপসজ্জা কক্ষে শিল্পীদের হাসি—সব মিলিয়ে শনিবারের এফডিসি হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত চলচ্চিত্র। একটি বিজ্ঞাপনচিত্র আর একটি ওয়েব ফিল্মের শুটিং—এই সাধারণ সূত্র ধরে যে গল্পের জন্ম হলো, তা প্রমাণ করে এফডিসি কেবল ইটের দেয়াল বা শুটিং ফ্লোর নয়, এটি বাংলাদেশের সিনেমার হৃদপিণ্ড। ক্যামেরার পেছনে ঘটে যাওয়া এসব আনন্দ-স্মৃতিই বারবার জানান দেয়, রঙিন পর্দার পেছনের এই জাদুকরী মুহূর্তগুলোই চলচ্চিত্রকে বারবার বাঁচিয়ে রাখে।
