AdvertisementAdvertisement

না ফেরার দেশে বর্ষীয়ান অভিনেত্রী রিনা রহমান

মঞ্চ, টেলিভিশন এবং রুপালি পর্দার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ ঘটল। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের জাদুতে দর্শকহৃদয় জয় করে নেওয়া বরেণ্য অভিনেত্রী রিনা রহমান আর আমাদের মাঝে নেই। সোমবার রাত নয়টার দিকে দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা এবং বার্ধক্যজনিত জটিলতাকে সঙ্গী করে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ অপু তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই প্রয়াণে দেশের শোবিজ অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

অভিনয়ের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের আড়ালে রিনা রহমানের জীবন ছিল এক অসম সংগ্রামের গল্প। মৃত্যুর পর তাঁর একটি পুরোনো সাক্ষাৎকার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে, যেখানে তিনি উন্মোচন করেছিলেন সাফল্যের পেছনের সেই কঠিন বাস্তবতার কথা। দীর্ঘ ক্যারিয়ার সত্ত্বেও শেষ জীবনে এসে তিনি যে চরম আর্থিক সংকট ও একাকীত্বের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা শোবিজের রূঢ় বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে। অসুস্থ শরীরেও অভিনয়ের প্রতি তাঁর অদম্য নেশা ছিল শেষ পর্যন্ত, তিনি বারবার বলতেন, মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত ক্যামেরার সামনে কাজ করে যেতে চান তিনি।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

খুলনা নাট্যনিকেতন থেকে অভিনয়ের হাতেখড়ি নেওয়া রিনা রহমান নৃত্যের ছন্দ আর গানের সুর পেরিয়ে থিতু হয়েছিলেন অভিনয়ের মায়াবী জগতে। মঞ্চে অভিনয়ের সেই স্বর্ণযুগের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে পূর্বসূরিদের সম্মানের যে সেতুবন্ধন, তা এখন অনেকটাই ম্লান। নবীনদের প্রতি তাঁর অভিযোগ ছিল, সিনিয়র শিল্পীদের সংগ্রাম ও অবদানের প্রতি আজকের প্রজন্মের সচেতনতার অভাব রয়েছে, যা একজন অভিজ্ঞ শিল্পীকে মানসিকভাবে কষ্ট দিত।

ব্যক্তিজীবনে অল্প বয়সেই স্বামীকে হারিয়ে চার সন্তানকে এক হাতে মানুষ করার লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি জীবিকার প্রয়োজনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চাকরি করেছেন, যাতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি মাথা নত করেননি। সাক্ষাৎকারে তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল সেই কষ্টের সুর—কাজের অভাব এবং পারিশ্রমিকের বৈষম্য তাঁকে বারবার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছিল। ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার মতো সামান্যটুকু নিশ্চিত করতেই তাঁকে কত যে আপস করতে হয়েছে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা ছিল।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

‘সংশপ্তক’, ‘ঘানি’ কিংবা ‘ঠিকানা’র মতো কালজয়ী কাজের মাধ্যমে তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ জীবনে এসে তাঁর চাওয়া ছিল অতি সামান্য—একটু স্বস্তি, সম্মান আর মাথা গোঁজার ঠাঁই। তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, শিল্পীদের চাওয়া বড় নয়, কেবল ভালোবাসা আর সম্মানটুকু পেলেই তারা তৃপ্ত। দীপ্ত টেলিভিশনের ‘পরম্পরা’ ধারাবাহিকের ‘ময়নার মা’ চরিত্রটিই ছিল তাঁর অভিনীত সর্বশেষ কাজ। জীবনের শেষভাগে এসে আর্থিক অনটন আর শারীরিক যন্ত্রণায় জর্জরিত থাকলেও অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অমর। রিনা রহমানের এই বিদায় কেবল একজন অভিনেত্রীর চলে যাওয়া নয়, বরং একটি প্রজন্মের সংগ্রামের সমাপ্তি, যা আমাদের শিল্পীদের জীবনের কঠিন সত্যগুলোকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

0%
0%
0%
0%