মস্কো উৎসবে প্রদর্শিত অতল সিনেমা যেভাবে নাঈম তুষারকে নতুন জীবন দিল

জীবনের খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসার গল্প সব সময় অনুপ্রেরণার। কিন্তু সেই ফেরাটা যদি হয় মৃত্যুর মুখ থেকে, তবে তা হয়ে ওঠে এক মহাকাব্যিক জয়গান। ঠিক এমনটাই ঘটেছে তরুণ অভিনেতা ও চিত্রগ্রাহক নাঈম তুষারের জীবনে। গভীর বিষণ্নতা আর আত্মহত্যার চিন্তা যখন তাঁর অস্তিত্বকে গ্রাস করতে বসেছিল, তখন জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় একটি সিনেমা। যুবরাজ শামীম পরিচালিত ‘অতল’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং নাঈমের কাছে এটি ছিল পুনর্জন্মের নামান্তর। ৪৮তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই সিনেমাটিই মূলত তাঁকে অন্ধকারের অতল থেকে আলোর পথে টেনে এনেছে।

বিজ্ঞাপন

পারিবারিক টানাপোড়েন, ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা আর অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে একসময় জীবনের প্রতি মায়া হারিয়ে ফেলেছিলেন নাঈম। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, সেই দুঃসময়ে সবকিছুই অর্থহীন মনে হতো। ২০২২ সালে করোনা মহামারীর এক অস্থির সময়ে পরিচালক যুবরাজ শামীমের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। শামীম নিজেও তখন প্রিয়জন হারানোর শোকে বিপর্যস্ত। সেই ব্যক্তিগত হতাশা আর মানসিক অস্থিরতাকে পুঁজি করেই তাঁরা দুজনে মিলে শুরু করেন ‘অতল’-এর নির্মাণকাজ। কোনো বড় আয়োজন বা প্রথাগত ইউনিটের সহায়তা ছাড়াই, একটি স্কুটি নিয়ে গাজীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে খুঁজে বের করেছেন লোকেশন। ক্যামেরার লেন্সের ভেতর দিয়ে নিজেদের ভেতরের ক্ষতগুলোকে শৈল্পিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁরা। সেই সৃজনশীল প্রক্রিয়াই নাঈমকে দ্বিতীয়বার জীবন উপহার দেয়।

তবে নাঈমের জীবনের লড়াই এই প্রথম নয়। ২০০০ সালের দিকে টানা ছয় বছর তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন। তখনো জীবন ছিল দিশেহারা। সেই অন্ধকার অধ্যায় পার করে তিনি কেবল নিজেই স্বাভাবিক জীবনে ফেরেননি, বরং মাদকের নেশায় হারিয়ে যাওয়া মানুষদের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে গড়ে তুলেছেন নিরাময় কেন্দ্র ‘আমার হোম’। অন্যের জীবনে আলো জ্বালানোর ব্রত নিয়েই তিনি এখন বেঁচে আছেন। অভিনয়ে জনপ্রিয়তা বা গ্ল্যামারের মোহ তাঁকে টানে না, বরং ক্যামেরার নেপথ্যে থেকে চিত্রগ্রহণের কাজ করতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

বর্তমানে তিনি নির্মাতা যুবরাজ শামীমের পরবর্তী সিনেমা ‘এক ঋতুর অনন্তকাল’-এর চিত্রগ্রহণের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে তিনি এখন একটি স্পিরিচুয়াল জার্নি বা আধ্যাত্মিক ভ্রমণ হিসেবে দেখেন। আত্মহত্যার সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা স্মরণ করে নাঈম বলেন, ‘প্রতিবারই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে মনে হয়েছে, জীবন একটাই। অন্যের জন্য কিছু করা বা কাউকে সহায়তা করার মাঝেই বেঁচে থাকার প্রকৃত অর্থ লুকিয়ে থাকে।’ অন্ধকার জয় করে আসা এই শিল্পীর জীবনদর্শন আজ অনেকের কাছেই আশার আলো হয়ে জ্বলছে।

বিজ্ঞাপন
0%
0%
0%
0%