নওগাঁ শহরের বেসরকারি মেট্রো হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় প্রসূতির পেটে গজ কাপড় রেখে সেলাই করে দেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেই প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বরত চিকিৎসকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুরে নওগাঁ সদর ১ নম্বর আমলি আদালতের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শুনানি শেষে এই চাঞ্চল্যকর আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৬ এপ্রিল নওগাঁ শহরের দক্ষিণ সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা রাহী মুনী সন্তান প্রসবের জন্য প্রথমে নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে যান। সেখানে দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে তার পরিবার মাত্র আট হাজার টাকায় প্রসূতিকে শহরের একটি অনিবন্ধিত বেসরকারি মেট্রো হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওই রাতেই মেট্রো হাসপাতালে অপারেশনকারী চিকিৎসক ফাবলিহা সাদিয়া শাফীন রাহী মুনীর সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন করেন।
অস্ত্রোপচারের পর থেকেই প্রসূতির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে তার পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়। রোগীর অবস্থার আরও অবনতি হলে পরদিন মেট্রো হাসপাতালেই তার পেটে দ্বিতীয় দফায় আরেকটি অস্ত্রোপচার করা হয় এবং সে সময় পেটের ভেতর থেকে ফেলে দেওয়া গজ কাপড় উদ্ধার করা হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ এপ্রিল প্রসূতি রাহী মুনী মারা যান।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। নওগাঁর সিভিল সার্জন তাৎক্ষণিকভাবে মেট্রো হাসপাতাল পরিদর্শন করে এটিকে একটি অনিবন্ধিত ও অবৈধ চিকিৎসালয় হিসেবে শনাক্ত করেন। সংবাদমাধ্যমে এই অবহেলাজনিত মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলে ১৩ এপ্রিল তা নওগাঁ সদর ১ নম্বর আমলি আদালতের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নজরে আসে এবং আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি আমলে নেন।
পরবর্তীতে আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র সংগ্রহ করে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পিবিআই ২২ আগস্ট আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এবং অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় বুধবার ধার্য তারিখে আদালত অভিযুক্ত ছয় আসামির বিরুদ্ধে এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিরা হলেন—অপারেশনকারী চিকিৎসক ফাবলিহা সাদিয়া শাফীন (২৯), অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগকারী চিকিৎসক মো. আখেরুজ্জামান রবি (৩৩), মেট্রো হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রিপন আলী (৩৭), অপারেশন থিয়েটারের ইনচার্জ মোসা. সালমা বিবি নাজমা (৩২), রোগী সংগ্রহকারী দালাল মো. রাশেদুল ইসলাম হিরু (৩৩) এবং মো. নাহিদ বাবু (২২)। এদিকে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহল।