ময়মনসিংহে বাসচাপায় একই পরিবারের চার প্রজন্মের চার সদস্য নিহত

ময়মনসিংহের আকুয়া বাইপাস এলাকায় গত শুক্রবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে জামালপুরগামী রাজীব পরিবহনের একটি বেপরোয়া বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে সিএনজির চার প্রজন্মের চার স্বজনসহ মোট সাতজন নিহত হয়েছেন। মর্মান্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনায় জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের দড়ি হামিদপুর গ্রামের মোফাজ্জল হোসেন লেবুর পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক, যা পুরো এলাকাবাসীকেই বাকরুদ্ধ করে তুলেছে।

দীর্ঘ ২০ বছর ধরে গাজীপুরে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন ৫০ বছর বয়সী মোফাজ্জল হোসেন লেবু। গত বৃহস্পতিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে তিনি নিজের ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা রাশিদা বেগম, ২৫ বছর বয়সী মেয়ে মর্জিনা আক্তার (যিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন) এবং মাত্র পাঁচ বছর বয়সী নাতি মিনানকে গাজীপুরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাড়ি আসেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরদিন শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে সিএনজিতে করে জামালপুর থেকে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওনা হন তারা। ময়মনসিংহ থেকে বাসে গাজীপুর যাওয়ার কথা ছিল তাদের। কিন্তু আকুয়া বাইপাস এলাকায় পৌঁছানোর পর একটি ঘাতক রাজীব পরিবহনের বাস তাদের বহনকারী সিএনজিটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই চারজনসহ মোট সাতজন নিহত হন এবং ঘাতক বাসচালক পালিয়ে যায়। দুর্ঘটনায় নিহত অপর তিন CNHযাত্রী হলেন সিএনজিচালক মো. সুজন আলী (৪৪), এবং জামালপুর সদর উপজেলার বাদেচান্দি গ্রামের আকরাম আলী (৫১) ও তাঁর স্ত্রী মমতা বেগম (৩৯)।

দুর্ঘটনার পর ময়মনসিংহের ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠান। আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ জামালপুরের দড়ি হামিদপুর এলাকায় পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠা এলাকার বাতাসে চার প্রজন্মের এই একসাথে চলে যাওয়া কেউ মেনে নিতে পারছেন না। নিহত মোফাজ্জল হোসেন লেবুর ছোট ভাই মোবারক হোসেন আহাজারি করে বলেন, "ভাই গত বৃহস্পতিবার বাড়িতে আসে এবং শুক্রবার মা, ভাইয়ের মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। দুপুরে শুনি রাজীব বাসের নিচে চাপা পড়ে তারা সবাই মারা গেছে। এই বাসগুলো সবসময় বেপরোয়া গতিতে চলে, আমি এই ঘাতক বাসগুলোর চলাচল বন্ধ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।" এছাড়া নিহত মর্জিনার শাশুড়ি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, "আমার ছেলের বউ আমার নাতিকে নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছিল, কিন্তু তারা আর ফিরল না। সরকার কি আমার ফুলের মতো নাতিকে ফিরিয়ে দিতে পারবে?"

শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় স্থানীয় বানারের পাড় মাদ্রাসা ঈদগাহ মাঠে নিহত চারজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়। একসাথে পরিবারের চার প্রজন্মের চার সদস্যকে হারিয়ে পুরো পরিবার এখন দিশাহারা।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতদের স্বজনেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, রাজীব পরিবহনের বাসগুলোর বেপরোয়া গতি এবং অদক্ষ চালকদের বেপরোয়া ড্রাইভের কারণে এই রুটে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে এবং অকালেই ঝরে যাচ্ছে বহু প্রাণ। তাই সাধারণ মানুষ এই রুটে রাজীব পরিবহনের বাস চলাচল চিরতরে বন্ধ করে নিরাপদ বিকল্প বাস সার্ভিস চালুর জোর দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে। এ বিষয়ে জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব জানান, দুর্ঘটনাটি ময়মনসিংহ থানা এলাকার হওয়ায় সেখানকার পুলিশই সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তবে নিহতদের বাড়ি জামালপুর সদরে হওয়ায় তিনি সার্বিক খোঁজখবর রাখছেন।

০%
০%
০%
০%