রংপুরে মাউশির ৪ বস্তা সরকারি নথিপত্র পাচারের সময় এলাকাবাসীর হাতে আটক

রংপুরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা (মাউশি) আঞ্চলিক উপ-পরিচালকের কার্যালয় থেকে দিনের আলোয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চার বস্তা সরকারি ফাইলপত্র ও নথিপত্র পাচারের সময় হাতেনাতে আটক করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে শিক্ষা অফিসের পেছনের সড়ক থেকে এই বস্তাগুলো আটক করা হয়। এ ঘটনার পর পুরো রংপুর শিক্ষা প্রশাসন ও জেলাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য এবং তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুরে বিভাগীয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অফিসের পেছনের সড়কে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় অত্যন্ত গোপনে চারটি মুখ সেলাই করা বড় বস্তা তোলা হচ্ছিল। স্থানীয়দের কাছে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে তারা দ্রুত এগিয়ে এসে অটোরিকশাটি ঘিরে ফেলেন এবং বস্তাগুলো আটকে দিয়ে পুলিশকে খবর দেন। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত অফিসের কর্মচারী আবু তালেব এবং গাড়িচালক মোহাম্মদ জাহিদ উপস্থিত লোকজনকে জানান যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং বিভাগীয় পরিচালকের সরাসরি নির্দেশেই তারা এসব বস্তা নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

এ ঘটনার পর অভিযোগের সরাসরি তীর উঠেছে বিভাগীয় উপপরিচালক কামরুজ্জামান পাইকার এবং পরিচালক মাজেদ আলীর দিকে। যদিও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে ‘চুরির অপচেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন, তবুও প্রধান স্টোররুম সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ ও অক্ষত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ভেতরে থাকা গোপন ও স্পর্শকাতর সরকারি নথি বস্তাবন্দি হয়ে বাইরে এল—তার কোনো সদুত্তর বা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেননি। গুরুত্বপূর্ণ এসব নথিপত্র গায়েব করার এই অপচেষ্টায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

এদিকে কিছুদিন আগেই এই আঞ্চলিক কার্যালয়ে সংক্রান্ত নথি যাচাই করতে অভিযান চালিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক আমীর আলীর দায়িত্বকালে এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক। সংস্থাটির রংপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এ কে এম নুরে আলম জানান, সাবেক পরিচালকের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে পাওয়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যালয়ের নথিপত্র যাচাইকালে সৈয়দপুর মহিলা মহাবিদ্যালয় ও নীলফামারীর মীরগঞ্জ হাট ডিগ্রি কলেজের দুই শিক্ষকের এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহারের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। তবে প্রায় দুই ঘণ্টা সফটওয়্যার অকার্যকর থাকা এবং অনেক নথির হার্ডকপি কার্যালয়ে সংরক্ষিত না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে সব ফাইল যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দুদকের এই অভিযানের ছয় দিন পার না হতেই গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রভরা চারটি বস্তা উদ্ধারের ঘটনায় গভীর রহস্য দেখছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু। তিনি বলেন, চার বস্তা কাগজ স্টোররুম থেকে এভাবে বাইরে নিয়ে যাওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো কারণ রয়েছে। এসব বস্তায় বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের গোপনীয় ফাইল রয়েছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। দুর্নীতির তথ্য গোপন বা অডিট আপত্তির প্রমাণ ধ্বংস করতেই পরিকল্পিতভাবে এসব নথি সরিয়ে ফেলা হচ্ছিল বলে অভিযোগ করে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

০%
০%
০%
০%