অস্ট্রেলিয়ার কাছে হার ওয়েস্ট ইন্ডিজের, পরিকাঠামোর অভাব নিয়ে বিস্ফোরক হেইলি ম্যাথিউস

চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালের হারটা কেবল একটি ম্যাচের ফলাফল নয়, বরং ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের কাঠামোগত দৈন্যদশার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৮ উইকেটের ব্যবধানে হেরে বিদায় নেওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক হেইলি ম্যাথিউস যে সুর তুলেছেন, তা ক্রীড়াঙ্গনের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য যথেষ্ট। অস্ট্রেলিয়া যেখানে পরিকল্পিত ব্যবস্থা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখছে, সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ লড়াই করছে কেবল প্রতিভার জোরে।

ম্যাচে আগে ব্যাট করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ নির্ধারিত ২০ ওভারে করতে পেরেছিল মাত্র ১২৫ রান। লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১৩ ওভারেই জয় নিশ্চিত করে ফেলে। বল হাতে নিয়ন্ত্রিত বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে কোনো সুযোগই দেননি অজিরা। ম্যাথিউস স্বীকার করেছেন, অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে মাঠের লড়াইয়ে নামার আগে তাদের প্রস্তুতির জায়গাটা অনেক দুর্বল। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও কাঠামোগত সহায়তা ছাড়া এমন পরাশক্তির বিপক্ষে জয় পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

ম্যাথিউস মনে করেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজে নারী ক্রিকেটের মূল সমস্যাটা তৃণমূল পর্যায়ে। ছোটবেলা থেকে ছেলেদের সাথে খেলে বড় হওয়া হেইলি ম্যাথিউস, স্তাফানি টেলর কিংবা ডিয়ান্ড্রা ডটিনদের মতো খেলোয়াড়রা ব্যতিক্রমী হিসেবে উঠে এসেছেন। কিন্তু নতুনদের জন্য সেই পথ সুগম নয়। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় যারা খেলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জের জন্য তারা মানসিকভাবে বা কৌশলীভাবে সেভাবে প্রস্তুত হয়ে আসেন না। অথচ ২০২৩ সাল থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যেসব ম্যাচ খেলেছে, তার প্রায় ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ রান এসেছে অভিজ্ঞ এই তিন তারকার ব্যাট থেকেই।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের বর্তমান চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্ট। হেইলি ম্যাথিউসের মতে, অতীতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ নারী ক্রিকেট মূলত বিশুদ্ধ প্রতিভার ওপর ভর করে বিশ্বমঞ্চে আধিপত্য বিস্তার করেছে। কিন্তু বর্তমানে ক্রিকেটে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ার সাথে সাথে দলগুলোর মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। যেসব দেশ নিয়মিত অর্থায়ন করছে, তারা তালিকার শীর্ষে থাকছে, আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলগুলো পড়ছে পিছিয়ে। অর্থের অভাব ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে নারী ক্রিকেটের প্রতিভাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ম্যাথিউস আরও বলেন, এটি ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। টাকা ও সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতা মাঠের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলছে। তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের দেশের জার্সি গায়ে খেলার তাড়না ও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার বিষয়টি তাকে এখনো উজ্জীবিত রাখে। তিনি চান, তার এই লড়াই ও অভিজ্ঞতা দেখে নতুন প্রজন্মের কিশোরীরা ক্রিকেটে আসুক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো হেইলি ম্যাথিউসকে এককভাবে লড়াই করতে না হয়।

অস্ট্রেলিয়ার এই জয় মাঠের ক্রিকেটে তাদের দক্ষতারই পরিচয় দেয়, কিন্তু এর পেছনে থাকা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের গল্পটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের হারের চেয়েও বড়। পরাজয় মানেই সবকিছুর শেষ নয়, বরং ম্যাথিউসের এই অকপট স্বীকারোক্তি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে রইল। এটি অজুহাত নাকি তিক্ত সত্য—সেই বিতর্কের অবকাশ থাকলেও, বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া যে বড় কোনো পরিবর্তন অসম্ভব, তা এখন স্পষ্ট।

০%
০%
০%
০%