Advertisement

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত সংস্কারের তাগিদ সিপিডির

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিললেও সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের পথে এখনো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা বিদ্যমান বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত এক মিডিয়া সংলাপে সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম মূল্যায়নে সংস্থাটি জানায়, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও রাজস্ব আদায়, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে উদ্বেগজনক স্থবিরতা রয়ে গেছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, ৩৬২টি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে শাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প-বাণিজ্য, ব্যাংক, জ্বালানি ও কৃষি খাতের ন্যায় নয়টি ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.১ শতাংশ থেকে কমে ৮.৩ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও একই সময়ে ৯.৩ শতাংশ থেকে কমে ৭.২ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে প্রকৃত মজুরিতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি, যার ফলে জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা এখনো সংকুচিত।

বিজ্ঞাপন

রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২.৩ শতাংশ থেকে ৪.৯ শতাংশে নেমে আসায় চলতি অর্থবছরে বড় ধরনের ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। তাদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছর নাগাদ ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে, যা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সৃষ্টি করবে। এর বিপরীতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো মৌলিক খাতগুলোর বরাদ্দ সুরক্ষিত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অস্বস্তিকর চিত্র ফুটে উঠেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুন সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে ৪.৫ শতাংশে নেমেছে এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির হারও ঋণাত্মক হয়েছে। পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি জটিলতা এবং জ্বালানি সরবরাহ পরিকল্পনার দুর্বলতায় টেক্সটাইল, ইস্পাত ও সিরামিক শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্চ-এপ্রিল সময়ে উৎপাদনশীল খাতের প্রবৃদ্ধি শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ব্যাংক খাতের সংস্কারে সরকারের কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকারিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে সিপিডি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মতে, পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠনসহ আর্থিক খাতের অস্থিরতা কাটাতে একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ অপরিহার্য। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩০.১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২.৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও বাণিজ্য ঘাটতি ও প্রবাসী আয়ের ধীরগতি অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

পরিশেষে, সরকার প্রধান তারেক রহমানসহ নীতিনির্ধারকদের প্রতি সিপিডির পরামর্শ হলো, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা। অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত ‘কোর বাজেট’ প্রণয়ন এবং রাজস্ব প্রশাসন ও ডিজিটালাইজেশনসহ কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। সামগ্রিক মূল্যায়নে সিপিডি স্পষ্ট করেছে যে, বিচ্ছিন্ন সাফল্য নয়, বরং জবাবদিহিমূলক সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেই নিহিত রয়েছে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চাবিকাঠি।

সম্পর্কিত- সিপিডি
0%
0%
0%
0%