কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শ্রমবাজার পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও করণীয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান বিস্তার বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এটি নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, এআই সরাসরি কর্মসংস্থান কমানোর পরিবর্তে বরং কাজের ধরন ও উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এআইয়ের কারণে চাকরির বাজার বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম, যা বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিদ্যমান চাকরির প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের ফলে স্বয়ংক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। আইসিটি ও ব্যবসায়িক সেবার মতো জ্ঞানভিত্তিক পেশাগুলোতে অটোমেশনের সুযোগ বেশি থাকলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এসব খাতে কর্মসংস্থানের হার সীমিত হওয়ায় তাৎক্ষণিক বড় ধরনের ধাক্কার সম্ভাবনা কম। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ ও মাঝারি দক্ষতার কর্মীরা এআইয়ের প্রভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এআই আশীর্বাদ হয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছোট উদ্যোক্তারা বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই বিদ্যমান সফটওয়্যার ও অ্যাপের মাধ্যমে এআই চ্যাটবট ব্যবহার শুরু করেছেন, যা তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য খাতের মতো কিছু ক্ষেত্রে এআই-এর সফল প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে, যেখানে মেডিকেল ইমেজিং প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে ডায়াবেটিসজনিত চোখের জটিলতা শনাক্তকরণের সক্ষমতা ৪০ শতাংশ বেড়েছে। তবে নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরির চেয়ে বিদ্যমান প্রযুক্তিকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াকেই অধিক যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার প্রসারে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির নীতিপত্র অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাতে অটোমেশনের কারণে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে নারী পোশাকশ্রমিকদের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হতে পারে। শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, অটোমেশনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।
অর্থনীতিবিদ জ্যঁ-লুই আরকাঁর মতে, যেসব দেশে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে তারা বরং লাভবান হতে পারে, তবে এর জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। প্রযুক্তির সুফল পেতে কেবল দক্ষতাই নয়, বরং উন্নত ইন্টারনেট সংযোগ ও প্রযুক্তি গ্রহণের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখাও একটি বড় শর্ত। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ যদি জাতীয় এআই নীতির সঠিক বাস্তবায়ন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি গ্রহণে বিদ্যমান বাধা দূরীকরণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করতে পারে, তবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথাযথ সুবিধা ভোগ করা সম্ভব হবে।
