দক্ষতা উন্নয়নে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত রেইজ প্রকল্প বদলাচ্ছে হাজারো তরুণের ভাগ্য

বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা আব্দুর রাজ্জাকের তিন বছর আগের দৈনিক আয় ছিল মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। দিনমজুরির অনিশ্চিত আয়ের চক্র থেকে বেরিয়ে আজ তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা, যার দোকানে নিয়মিত কাজ করছেন ছয়জন কর্মী। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট বা ‘রেইজ’ প্রকল্পের আওতায় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়েই তাঁর এই রূপান্তর সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে রাজ্জাকের মাসিক আয় প্রায় ১ লাখ টাকার কাছাকাছি, যা তাঁর দীর্ঘদিনের অভাবী জীবনের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
দেশের বেকার ও নিম্ন আয়ের পরিবারের তরুণদের দক্ষ করে তোলার লক্ষ্যে ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করে রেইজ প্রকল্পটি। বিশ্বব্যাংক ও পিকেএসএফের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের আওতায় সারা দেশের ৬৪টি জেলার ৩৮০টির বেশি উপজেলায় প্রায় সোয়া চার লাখ তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ওস্তাদ-শাগরেদ মডেলের মাধ্যমে ২৬টি ভিন্ন ভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তরুণ প্রজন্ম অনানুষ্ঠানিক খাতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে।
প্রকল্পটির দ্বিতীয় ধাপে প্রায় সোয়া ২ লাখ উদ্যোক্তাকে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। যশোরের সুমন মজুমদারের মতো অনেক উদ্যোক্তা এই সহায়তায় নিজেদের ব্যবসার পরিধি ও মুনাফা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছেন। এছাড়া করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেড় লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও কাজ করছে এই প্রকল্প। বর্তমানে প্রকল্পটি ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে এবং এর মোট অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ কোটি ২৪ লাখ মার্কিন ডলার।
প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী তরুণদের কর্মসংস্থানের হার প্রায় ৮৮ শতাংশ, যা এই উদ্যোগের কার্যকারিতাকে প্রমাণ করে। প্রশিক্ষণ শেষে এই তরুণ-তরুণীরা মাসিক ৯ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন, যা প্রথাগত ভোকেশনাল শিক্ষার তুলনায় অত্যন্ত সম্মানজনক ও টেকসই। পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের জানান, দেশীয় সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ওস্তাদ-শাগরেদ মডেলটি আধুনিকায়নের ফলে অনানুষ্ঠানিক খাতের তরুণরা দ্রুত শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন।
সামাজিক বৈষম্য নিরসনে নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে রেইজ প্রকল্পে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দিনাজপুরের ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া বয়েতা খাতুন কিংবা ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশনে দক্ষ হয়ে ওঠা ফান্সিস কিস্কুর মতো অগণিত তরুণ আজ স্বাবলম্বী। এই কর্মসহায়ক উদ্যোগ কেবল ব্যক্তিপর্যায়ে আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করছে না, বরং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
