দশ বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকা মুনাফার পরও বিপিসিতে চরম তারল্যসংকট ও জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকি

গত এক দশকে প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার বিশাল মুনাফা অর্জন করলেও বর্তমানে চরম তারল্যসংকটে পড়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাটি এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই যে, জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় ঋণপত্র বা এলসি খোলার অর্থ সংস্থান নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বিপিসির অভ্যন্তরীণ নথি ও পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসে জ্বালানি আমদানি ও বিক্রয় বাবদ সংস্থাটির আর্থিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায়। এর মধ্যে জুন মাসের প্রথম ২৩ দিনেই ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। সংস্থাটি প্রতি মাসে গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি বিপিসির নগদ প্রবাহের ওপর পড়ছে।
দীর্ঘদিন লোকসানে থাকার পর ২০১৩ সালের পরবর্তী সময়ে বিপিসি মুনাফার ধারায় ফিরে আসে। তবে গত ১০ বছরে অর্জিত মুনাফার একটি বড় অংশ, প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা, সরকার কোষাগারে লভ্যাংশ ও কর হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থ উন্নয়ন প্রকল্প ও পরিচালন ব্যয়ে ব্যবহৃত হওয়ায় সংকটময় সময়ে জরুরি তহবিল হিসেবে ব্যবহারের মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ বিপিসির হাতে ছিল না। গত ৯ মার্চ বিপিসির ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা ৩৬ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা ২৮ জুন নাগাদ ১৮ হাজার ৫২৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন, জ্বালানি আমদানির স্বাভাবিক ধারা বজায় রাখতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি, তবুও উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ চলতি ব্যয়ে ব্যবহার করায় ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বিপিসির প্রকৃত তারল্যসংকট এবং অতীত মুনাফার ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানের নিরীক্ষা প্রয়োজন। বর্তমানে ডিজেল বিক্রিতে প্রতি লিটারে প্রায় ৬০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে বিপিসিকে, যা সংস্থাটির আর্থিক সক্ষমতাকে দ্রুত ক্ষয় করছে। ১৪ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সহায়তা চেয়ে পাঠানো চিঠির বিপরীতে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি, ফলে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে দেশের জ্বালানি খাতের এই প্রধান চালিকাশক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে।
