বিশ্বকাপ ফুটবলের বাণিজ্যিক মহাযজ্ঞে ফিফার বিপুল মুনাফা ও সমর্থকদের রেকর্ড ব্যয়

ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল মাঠের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির এক বিশাল ও প্রভাবশালী আসর। ২০২৬ সালের ফুটবল মহাযজ্ঞে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অধিক সংখ্যক ম্যাচ আয়োজনের ফলে একদিকে যেমন দর্শক চাহিদার রেকর্ড ভেঙেছে, অন্যদিকে তেমনি বাণিজ্যের পরিমাণ পৌঁছেছে শত শত কোটি ডলারের চূড়ায়। তবে এই অর্থনৈতিক মহোৎসবে ফিফা, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট স্পনসররা বিশাল মুনাফা অর্জন করলেও, সাধারণ দর্শক ও সমর্থকদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে আকাশচুম্বী ব্যয়ের এক দুঃসহ দায়।
বৈশ্বিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার জন্য বিশ্বকাপ আয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী উৎস। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ থেকে সংস্থাটি রেকর্ড ৭৬০ কোটি ডলার আয় করেছিল। ডয়চে ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ ম্যারিয়ন লাবোর প্রাক্কলন করেছেন যে, আসন্ন আসরগুলোতে ফিফার মোট আয় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রির পাশাপাশি টিকিট পুনর্বিক্রির আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন আদায় করে সংস্থাটি তাদের আয়ের পথ আরও প্রশস্ত করেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, দর্শক ও বাজার বাড়াতে ভবিষ্যতে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৬৪-তে উন্নীত করা হতে পারে।
বিশ্বকাপের টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। ফাইনালের টিকিটের আনুষ্ঠানিক মূল্য ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার বা ৪০ লাখ ৫৫ হাজার ৩১০ টাকায় ঠেকেছিল, যা পুনর্বিক্রির বাজারে ২৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকেও এই উচ্চমূল্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। এর ওপর সমর্থকদের বিমানভাড়া, হোটেল ও স্থানীয় পরিবহনব্যয় ছিল সাধারণ সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি। উদাহরণস্বরূপ, মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সাধারণ যাতায়াত ভাড়াকে বিশ্বকাপ চলাকালে ১২ দশমিক ৯০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৫০ ডলারে উন্নীত করা হয়েছিল, যা পর্যটন খাতে বাড়তি অস্থিরতা তৈরি করেছে।
সম্প্রচারস্বত্ব কেনা টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোও বিজ্ঞাপনের উচ্চ চাহিদার মাধ্যমে তাদের বিনিয়োগ পুষিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। ফক্স স্পোর্টস প্রায় ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয়ে সম্প্রচারস্বত্ব কিনে নকআউট পর্বের প্রতি ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের মূল্য ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিল। খেলা চলাকালীন ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানি পানের বিরতিকে কাজে লাগিয়ে স্পনসররা নতুন বিজ্ঞাপনের সুযোগ পেয়েছে। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ডেভিড বেকহামের ডিজিটাল প্রচারণা এবং ইন্টার মায়ামির মতো ক্লাবের ১৪৫ কোটি ডলারের বাজারমূল্য বাণিজ্যিক ফুটবলের বিশাল বিস্তৃতিকেই নির্দেশ করে।
আর্থিক বিশ্লেষক আলেকজান্ডার বাডজিয়ারের মতে, এই বিশাল ক্রীড়া আসর থেকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। যদিও ফিফার দাবি অনুযায়ী বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার যোগ হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তবুও বিশেষজ্ঞরা একে স্বল্প মজুরির আতিথেয়তা খাতের সাময়িক প্রভাব বলেই মনে করছেন। এছাড়া পর্যটন খাতে হোটেল বুকিংয়ের প্রত্যাশিত উচ্চ চাহিদা অনেক ক্ষেত্রেই পূরণ হয়নি। বরং বাজি ধরার বাজার বা বেটিং ইকোনমি গতবারের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা আধুনিক ক্রীড়া বাণিজ্যের এক বিতর্কিত অথচ শক্তিশালী দিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।