রপ্তানি চাঙ্গা হলেও অভ্যন্তরীণ মন্দা ও কর্মসংস্থান সংকটে চীনের প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৩ শতাংশে

রপ্তানি খাতে অভাবনীয় সাফল্য সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বাজারে চরম মন্দা ও কর্মসংস্থানের ঘাটতির কারণে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির বিশ্বব্যাপী বিপুল চাহিদার ওপর ভর করে দেশটির রপ্তানি খাত চাঙ্গা থাকলেও, গত তিন বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে ধীরগতির অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতি। জুন মাসে শেষ হওয়া প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪.৩ শতাংশে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৫ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কানাডার এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিনা নাজিবুল্লাহর মতে, চীনের বর্তমান অর্থনীতিতে দুটি ভিন্ন চিত্র দৃশ্যমান; একদিকে রপ্তানি খাতে জোয়ার বইছে, অন্যদিকে স্থানীয় ভোক্তাদের কেনাকাটার প্রবণতা অত্যন্ত হতাশাজনক। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জুন মাসে দেশটির রপ্তানি বেড়েছে রেকর্ড ২৭ শতাংশ, যা মে মাসের ১৯.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি। এর ফলে জুন মাসে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২৫.৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের মাসে ছিল ১০৫.৪ বিলিয়ন ডলার।

রপ্তানির এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বিশ্ববাজারে চীনের অংশীদারদের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে, যারা দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিংকে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা দূর করার তাগিদ দিয়ে আসছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সচল করতে হিমশিম খাচ্ছে শি জিনপিংয়ের প্রশাসন, যার মূল কারণ আবাসন খাতের নজিরবিহীন পতন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সহকারী অধ্যাপক জুলিয়েট লু উল্লেখ করেছেন যে, চীনের সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চয়ের সিংহভাগ আবাসন খাতে বিনিয়োগ করেছিলেন, কিন্তু ফটকামূলক এই খাতের ধসের কারণে কোটি কোটি গ্রাহক তাদের সঞ্চয় হারিয়ে এখন কেনাকাটা কমিয়ে সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকছেন।

করোনা মহামারির ক্ষতি এবং আবাসন সংকটের দ্বিমুখী ধাক্কায় চীনের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার দ্য চায়না ইনস্টিটিউটের একাডেমিক ফ্যাকাল্টি উপদেষ্টা রেজা হাসমাথ বলেন, রপ্তানি ইঞ্জিন তীব্র গতিতে চললেও দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে ২৫ বছরের কম বয়সী তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভালো কাজের সুযোগ হ্রাস পাওয়া এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণে বেইজিংকে অদূর ভবিষ্যতে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

বিজ্ঞাপন

রেজা হাসমাথ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বজায় রাখলে দেশটির অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এই সংকটের আঁচ ছড়িয়ে পড়বে। তবে এই মন্দা সত্ত্বেও বেইজিং কোনো বড় ধরনের আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। ইন্টারন্যাশনাল গভর্নেন্স ইনোভেশন সেন্টারের অর্থনীতিবিদ মার্ক ক্রুগার জানান, চীনা সরকার নতুন করে ব্যয়ের চেয়ে ঋণ পরিশোধে বেশি মনোযোগী এবং চলতি বছরের এ পর্যন্ত গড় প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশ হওয়ায় নীতি নির্ধারকরা এখনই আতঙ্কিত হচ্ছেন না, কারণ এটি তাদের বার্ষিক ৪.৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেই রয়েছে।

চীনের এই অর্থনৈতিক মন্দার সমান্তরালে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল চীনের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র অ্যাডজান্ট ফেলো রেচেল জিয়েম্বা মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চ মূল্য চীনে নতুন করে মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার মাধ্যমে দেশটির প্রবৃদ্ধির গতিকে আরও শ্লথ করে দিতে পারে।

0%
0%
0%
0%